
কংগ্রেসের হাত ছেড়ে একসময় যারা নিজেদের নতুন রাজনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন, ভারতের সেই শীর্ষ আঞ্চলিক দলগুলো কি আবার পুরোনো ঘরেই ফিরে যাচ্ছে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) এবং শরদ পাওয়ারের জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টির (এনসিপি) কংগ্রেসে একীভূত হওয়ার গুঞ্জনে এখন জাতীয় রাজনীতিতে তীব্র জল্পনা শুরু হয়েছে। তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকটের আবহে রাজনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, বিজেপির বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ ভোট বিভাজন রুখতে এক ছাতার নিচে আসার পরিকল্পনা চলছে পর্দার আড়ালে।
যদিও গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কেসি বেণুগোপাল তৃণমূলের এই সংযুক্তির আলোচনাকে ‘ভিত্তিহীন গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, তবে মহারাষ্ট্রের বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা নানা পাটোলে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এমন একটি প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
পাটোলে জানান, ‘সমমনোভাবাপন্ন দলগুলো’ কংগ্রেসে একীভূত হওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "শরদ পাওয়ার এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মানসিকতা তৈরি করছেন।"
পাটোলে জোর দিয়ে বলেন, এটি কোনো নির্বাচনী জোট হবে না, বরং সরাসরি সংযুক্তি হবে। তিনি আরও দাবি করেন যে, এনসিপি-এসপি সংযুক্তির একটি প্রস্তাব শরদ পাওয়ারের পক্ষ থেকে আগেই দেওয়া হয়েছিল এবং তা বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি বলেন, "পাওয়ার সাহেবের পক্ষ থেকে এনসিপির প্রস্তাবটি আগেই দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কিছু কারণে তা বিলম্বিত হয়। তবে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমার মনে হয়... বিপুল পরিমাণ ভোটের বিভাজন ঠেকাতে ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী আদর্শের সকল দলের এক হওয়া উচিত।"
তিনি আরও দাবি করেন, "জাতীয় স্তরে এই প্রক্রিয়া এখন শুরু হয়ে গেছে এবং তৃণমূল কংগ্রেস হোক বা পাওয়ার সাহেব—সবাই এখন কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যাওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছেন।"
কয়েক দিন আগে শিবসেনা (ইউবিটি) নেতা সঞ্জয় রাউতও একই সুর মিলিয়েছিলেন। তিনি শরদ পাওয়ারকে অনুরোধ করেছিলেন, যেন তিনি উদ্যোগ নিয়ে কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হওয়া ছোট ছোট আঞ্চলিক দলগুলোকে আবার দেশের এই প্রাচীনতম দলটির সঙ্গে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসেন। রাউত বলেছিলেন, "কংগ্রেসকে শক্তিশালী হতে হবে এবং দলটি থেকে বেরিয়ে আসা ছোট দলগুলোর নেতাদের বর্তমান পরিস্থিতি অনুধাবন করতে হবে।"
এই প্রস্তাবকে একটি ‘ভালো প্রস্তাব’ হিসেবে আখ্যায়িত করে শরদ পাওয়ারের কন্যা তথা এনসিপি-এসপি নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে একটি রহস্যময় ও রসাত্মক প্রতিক্রিয়া দেন। প্রস্তাবটি সরাসরি নাকচ না করে তিনি বলেন, "আগে বৃষ্টি আসুক, তারপর দেখা যাবে ছাতা নেব নাকি রেইনকোট।"
এদিকে রাজনৈতিক এই গুঞ্জনকে আরও উসকে দিয়ে রাজস্থানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা অশোক গেহলটও ছোট দলগুলোকে কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার এবং রাহুল গান্ধীকে নেতা হিসেবে মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। গেহলট বলেন, "সঞ্জয় রাউত যা বলেছেন তার যৌক্তিকতা আছে। সময় এসে গেছে। কংগ্রেস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেসব দল আঞ্চলিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল, তাদের আবার ফিরে আসা উচিত এবং মন থেকে রাহুল গান্ধীকে নেতা হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত।"
তিনি আরও যোগ করেন, "সারা দেশে এই বার্তা স্পষ্ট হওয়া উচিত যে, ইন্ডিয়া জোটের নেতা হলেন রাহুল গান্ধী। বার্তাটি একদম পরিষ্কার হতে হবে। তাহলেই জনগণ আপনাদের সফল করবে। মানুষ দেখছে একদিকে আছেন নরেন্দ্র মোদি এবং অন্যদিকে রাহুল গান্ধী। সব রাজনৈতিক দল মিলে রাহুল গান্ধীকে নেতা হিসেবে মেনে নিয়েছে—এই স্পষ্ট বার্তা যদি পৌঁছায়, তবে দেশের ভোটের ধরনই বদলে যাবে।"
অতীত ও ভবিষ্যৎ: দল ভাঙার ইতিহাস
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শরদ পাওয়ার উভয়ই একসময় কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে দল থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের আঞ্চলিক দল গঠন করেছিলেন।
তৃণমূল কংগ্রেস: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন।
এনসিপি: অন্যদিকে ১৯৯৯ সালে সোনিয়া গান্ধীর ‘বিদেশি বংশোদ্ভূত’ হওয়ার ইস্যুকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর পিএ সাংমা এবং তারিক আনোয়ারকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি) প্রতিষ্ঠা করেন শরদ পাওয়ার। অবশ্য তারিক আনোয়ার পরবর্তীতে কংগ্রেসে ফিরে আসেন এবং বর্তমানে তিনি একজন সংসদ সদস্য।
তৃণমূল কংগ্রেস আজ যে ধরনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি, ২০২৩ সালে শরদ পাওয়ারের এনসিপিও প্রায় একই রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। পাওয়ারের ভাইপো অজিত পাওয়ারের নেতৃত্বে দলে এক বড় বিদ্রোহ দেখা দেয়। অধিকাংশ বিধায়কের সমর্থন নিয়ে অজিত পাওয়ার এনসিপির নাম ও দলীয় প্রতীক নিজের দখলে নেন এবং মহারাষ্ট্র ও জাতীয় স্তরে বিজেপি এবং শিবসেনা (শিন্ডে) জোটের সঙ্গে হাত মেলান।
কংগ্রেস চায় তৃণমূলই প্রথম পদক্ষেপ নিক
চলতি সপ্তাহে তৃণমূল ও কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ব্যাক-টু-ব্যাক বৈঠকের পর এই গুঞ্জন আরও তীব্র রূপ নেয়। প্রথমে গত মঙ্গলবার (৯ জুন) তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেসের শীর্ষ নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করেন এবং এর পরপরই বুধবার (১০ জুন) তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে দেড় ঘণ্টাব্যাপী একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন।
সূত্র মারফত জানা গেছে, বুধবারের বৈঠকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বার্তা দিয়েছেন যে তৃণমূল কেন্দ্রে একটি শক্তিশালী জোট চায় এবং বিরোধী জোটে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বকে তারা মন থেকে মেনে নিচ্ছে। তবে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, সংযুক্তির যেকোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব তৃণমূলের পক্ষ থেকেই আসতে হবে; কংগ্রেস নিজে থেকে এই বিষয়ে কোনো চাপ সৃষ্টি বা আগ বাড়িয়ে প্রস্তাব দেবে না।