
পেনশনভোগী ও মধ্যবিত্তের আস্থার প্রতীক হিসেবে পরিচিত জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় বড় ধরনের ধাক্কা দিল সরকার। সাধারণ মানুষের আয়ের এই উৎসে করের বোঝা একলাফে দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন সরকারি নিয়মানুযায়ী, যেকোনো ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফা তোলার সময় এখন থেকে সরাসরি ১০ শতাংশ হারে অগ্রিম কর (অ্যাডভান্স ট্যাক্স) কেটে রাখা হবে। বর্তমান নিয়ম অনুসারে, ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কার্যকর ছিল।
সরকারের এই আকস্মিক নীতি পরিবর্তনের ফলে সঞ্চয়পত্রের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আগের চেয়ে অনেকটাই কম লভ্যাংশ হাতে পাবেন। বিশেষ করে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং নির্দিষ্ট আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর ওপর এর একটি নেতিবাচক ও সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা।
গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর বিদ্যমান চূড়ান্ত কর দায় (ফাইনাল ট্যাক্স লায়াবিলিটি) প্রথা সম্পূর্ণ বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। এতদিন পর্যন্ত মুনাফা থেকে কেটে নেওয়া ৫ শতাংশ করই চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচিত হতো, যার ফলে বিনিয়োগকারীকে পরে আর বাড়তি কোনো ঝামেলা পোহাতে হতো না। কিন্তু নতুন প্রস্তাব পাস হলে এই করের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে ১০ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে।
দেশের একটি বিশাল সংখ্যক মধ্যবিত্ত পরিবার ও অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগী নাগরিক মূলত সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে থাকেন। তাদের অনেকেই এই মুনাফার অর্থ দিয়ে প্রতি মাসের নিত্যদিনের সংসার খরচ চালান। এখন অতিরিক্ত অগ্রিম কর কাটার কারণে তাদের হাতে আসা প্রকৃত টাকার পরিমাণ অনেকটাই কমে যাবে।
সহজ একটি হিসাব দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যাক— বর্তমানে সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত পরিবার সঞ্চয়পত্রের ওপর বার্ষিক মুনাফার হার ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ। সেই হিসাবে, প্রতি এক লাখ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে একজন গ্রাহক মাসে ৯৯৪ টাকা ১৭ পয়সা মুনাফা পান। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী ৫ শতাংশ উৎসে কর কেটে নেওয়ার পর গ্রাহক হাতে পেতেন ৯৪৫ টাকা। এখন করের হার দ্বিগুণ করে ১০ শতাংশ করার ফলে গ্রাহক প্রতি লাখে ৯০০ টাকারও কম হাতে পাবেন।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ’-এর চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, "সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার দ্বিগুণ হওয়ায় মধ্যবিত্তের ওপর চাপ বাড়বে। কারণ, দেশের মধ্যবিত্তের একটা বড় অংশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার টাকা সংসার চালাতে ব্যবহার করেন। এখন মুনাফা থেকে আগের চেয়ে বেশি টাকা কেটে নিলে চাপে পড়বেন তারা। মধ্যবিত্তশ্রেণিকে স্বস্তি দিতে এই বাড়তি অগ্রিম কর বাদ দেওয়া উচিত।"
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন পদক্ষেপ
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মূলত অর্থবিল ২০২৬–এর মাধ্যমে করের এই নতুন নিয়ম সংযোজন করা হয়েছে। এর জন্য ২০২৩ সালের আয়কর আইনের ১৬৩ নম্বর ধারা সংশোধন করেছে সরকার। সেই সংশোধনীতে উৎসে করকে অগ্রিম কর হিসেবে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং অবসান ঘটানো হয়েছে চূড়ান্ত কর দায় প্রথার। তবে এই সংশোধনের ফলে একটি নতুন সুযোগও তৈরি হয়েছে; যদি কোনো করদাতার বছর শেষে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার পর দেখা যায় যে তার কেটে রাখা অগ্রিম কর প্রদেয় আয়করের চেয়ে বেশি হয়েছে, তবে তিনি সেই অতিরিক্ত টাকা ফেরত (রিফান্ড) পাবেন।
সংশোধিত ধারা অনুযায়ী, এখন থেকে সঞ্চয়পত্রের লভ্যাংশের ওপর ১০ শতাংশ অগ্রিম কর কেটে রাখা হবে। পরবর্তীতে করদাতা যখন তার বার্ষিক আয়কর রিটার্ন জমা দেবেন এবং হিসাব শেষে যদি দেখা যায় সঞ্চয়পত্র থেকে কেটে নেওয়া অগ্রিম করের পরিমাণ তার মূল প্রদেয় আয়করের চেয়ে বেশি, তবে তিনি অতিরিক্ত অর্থ ফেরত পাবেন। এ জন্য করদাতাকে নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর উল্লেখ করে আয়কর বিভাগে আবেদন করতে হবে। এরপর এনবিআরের আয়কর বিভাগ যাবতীয় তথ্য যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী ১২০ দিনের মধ্যে অতিরিক্ত টাকা গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে ফেরত দেবে।
বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীনে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু রয়েছে। এগুলো হলো— পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। এর মধ্যে পরিবার সঞ্চয়পত্র বাদ দিয়ে বাকি তিন ধরনের সঞ্চয়পত্রে সাধারণ ব্যক্তির পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থাও বিনিয়োগের সুযোগ পায়। এই সঞ্চয়পত্রগুলোর মেয়াদপূর্তি সাপেক্ষে সুদের বা মুনাফার হার সর্বনিম্ন ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে।
অন্যদিকে, আজ রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে সঞ্চয়পত্রের কর বৃদ্ধির এই স্পর্শকাতর বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জমান মজুমদার অবশ্য ভিন্ন দাবি করেছেন। তিনি বলেন, "এবারের বাজেটে সঞ্চয়পত্র নিয়ে নতুন কিছু করা হয়নি।"