
দেশের কর ও রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের ঘোষণা এসেছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে। ব্যক্তি কর, শুল্ক ছাড়, ভ্যাট নীতি, অনলাইন কর ব্যবস্থা থেকে শুরু করে প্রযুক্তি ও শিল্প খাত পর্যন্ত একাধিক ক্ষেত্রে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে কর আদায় বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে আরও ডিজিটাল ও প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব পরিবর্তনের ঘোষণা দেন।
করমুক্ত আয়সীমায় পরিবর্তন
ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে পৌনে চার লাখ টাকা করা হয়েছে, যা বর্তমানে সাড়ে তিন লাখ টাকা। আগামী দুই অর্থবছর এই সীমা অপরিবর্তিত থাকবে। এরপর ধাপে ধাপে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে তা চার লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। নারী ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা চার লাখ ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী করদাতাদের জন্য তা পাঁচ লাখ টাকা এবং গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই আন্দোলনকারীদের জন্য পাঁচ লাখ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত রাখা হয়েছে।
নিত্যপণ্য ও কৃষিপণ্যে কর ছাড়
মূল্যস্ফীতি কমাতে ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানো হয়েছে। ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন পণ্যে কর হ্রাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জিরা, দারুচিনি, এলাচি, লবঙ্গ, গোলমরিচ ও ধনিয়ার ওপর পাঁচ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক তুলে নেওয়া হয়েছে। খেজুর আমদানিতেও শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং শিশুখাদ্য আমদানিতে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে।
কর্পোরেট কর অপরিবর্তিত, উৎসে করে পরিবর্তন
আগামী অর্থবছরে কর্পোরেট করের হার অপরিবর্তিত থাকবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে করের হার কমিয়ে করের আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। উৎসে কর্তিত করকে ‘ন্যূনতম কর’ না ধরে এটিকে ‘অগ্রিম কর’ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং অতিরিক্ত কর ফেরত দেওয়া হবে। সরকার জানিয়েছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
কর রিটার্ন সারা বছর জমা দেওয়ার সুযোগ
আয়কর ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন হিসেবে এখন থেকে সারা বছর রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে। সময়ভিত্তিক প্রণোদনাও থাকবে। জুলাই-সেপ্টেম্বরে রিটার্ন দিলে করের পাঁচ শতাংশ বা ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড়, অক্টোবর-ডিসেম্বরে কোনো ছাড় নেই, জানুয়ারি-মার্চে দুই শতাংশ বা তিন হাজার টাকা এবং এপ্রিল-জুনে পাঁচ শতাংশ বা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি কর দিতে হবে।
ডিজিটাল অর্থনীতি ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ভ্যাট অব্যাহতি
কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ফ্রিল্যান্সার ও স্টার্টআপদের সম্পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। মোবাইল সিমের ওপর ৩০০ টাকার কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। মোবাইল, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টারসহ প্রযুক্তিপণ্যের স্থানীয় উৎপাদনে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা বাড়ানো হয়েছে।
ওষুধ শিল্প ও স্বাস্থ্যখাতে বড় ছাড়
ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের জন্য ৭৭টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট তুলে নেওয়া হয়েছে। ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধ উৎপাদন ও এপিআই খাতে ৫১টি কাঁচামাল শুল্কমুক্ত করা হয়েছে। আরও ১৭টি উপকরণ শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে।
বৈদ্যুতিক যানবাহনে কর সুবিধা
ইলেকট্রিক গাড়ি, বাস ও ই-বাইকের ক্ষেত্রে শুল্ক-কর ছাড়ের সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ই-বাস আমদানি সম্পূর্ণ করমুক্ত থাকবে। ইভি শিল্পে স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করতে যন্ত্রাংশ আমদানিতে বড় ধরনের কর ছাড় দেওয়া হয়েছে।
রিফান্ডভিত্তিক নতুন কর নীতি
উৎসে কর কাঠামোয় পরিবর্তন এনে অতিরিক্ত কর রিফান্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আগে এটিকে ন্যূনতম কর হিসেবে গণ্য করা হতো, যা এখন বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি কর ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অটোমেশনের আওতায় আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বাজেটে জানান, এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা হবে এবং কর ফাঁকি রোধ করে রাজস্ব আদায় বাড়ানো হবে।