
দীর্ঘ সাড়ে তিন মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে বরফ গলতে শুরু করেছে ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কে। সবকিছু ঠিক থাকলে আজ রোববার (১৪ জুন) ওমান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে চলমান যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা সরাসরি উপস্থিত না হয়ে ‘দূরবর্তীভাবে’ অর্থাৎ ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে এই চুক্তিতে সই করবেন বলে জানা গেছে।
শনিবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের ইতিবাচক বার্তার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও আজই চুক্তি সইয়ের বিষয়ে জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তবে তেহরান কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়ে জানিয়েছে, চুক্তি আজ রোববারই নয়, বরং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে চূড়ান্ত হতে পারে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স ও এএফপির প্রতিবেদনে এই ভূরাজনৈতিক অগ্রগতির তথ্য উঠে এসেছে।
চুক্তির ব্যাপারে কার কী অবস্থান?
ডোনাল্ড ট্রাম্প: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, “আগামীকাল (আজ রোববার) চুক্তিটি সই হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তি সই হওয়ার পরপরই হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে।”
শাহবাজ শরিফ: মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক্সে (টুইটার) লিখেছেন, “আমরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন শান্তিচুক্তির সবচেয়ে কাছাকাছি আছি। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত রূপ পেতে পারে।”
ইরান প্রশাসন: ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া বেশ কাছাকাছি হলেও সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হতে পারে।
সম্ভাব্য চুক্তিতে কী কী থাকছে?
প্রস্তাবিত এই সমঝোতা চুক্তির মূল ধারাগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা না হলেও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্যমতে চুক্তিতে মূলত নিচের বিষয়গুলো থাকছে
হরমুজ প্রণালি উন্মুক্তকরণ: চুক্তি সইয়ের সাথে সাথেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার: ইরানের বিভিন্ন বন্দর লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া বর্তমান নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হবে।
নিষেধাজ্ঞা শিথিল: ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল করা হবে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে জব্দ থাকা ইরানের অর্থের কিছু অংশ ছাড় দেওয়া হতে পারে।
পারমাণবিক ইস্যুর ভবিষ্যৎ: এই প্রাথমিক চুক্তিতে জটিল পারমাণবিক ইস্যুটি এখনই অন্তর্ভুক্ত থাকছে না। তবে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে দুই পক্ষ আলোচনার ভিত্তিতে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
ইউরেনিয়াম নিয়ে রয়ে গেছে মতবিরোধ
হোয়াইট হাউসের দাবি, প্রাথমিক সমঝোতায় ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বাতিল এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস বা অন্য দেশে স্থানান্তর করতে রাজি হয়েছে। তবে ইরান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে স্পষ্ট জানিয়েছে, তাদের ইউরেনিয়াম কোনো দেশে স্থানান্তর বা ধ্বংস করা হবে না; বরং দেশের ভেতরে রেখেই তার মান (সমৃদ্ধকরণের মাত্রা) কমিয়ে আনা হবে।
এদিকে মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের খবর, যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক অভিযান চালিয়ে ইউরেনিয়াম ছিনিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা রুখতে ইরান তাদের ভূগর্ভস্থ টানেলগুলোর প্রবেশপথে বিস্ফোরক মাইন বসিয়ে মজুত আরও সুরক্ষিত করেছে। বর্তমানে ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি মানের প্রায় ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে।
সংঘাতের পটভূমি
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে ব্যাপক সামরিক আগ্রাসন শুরু করে। হামলার প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব নিহত হন। পরবর্তীতে দীর্ঘ ৪০ দিন যুদ্ধের পর গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। দীর্ঘ কূটনৈতিক টানাপোড়েন শেষে আজ দুই দেশ একটি স্থায়ী চুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।
সূত্র: রয়টার্স ও এএফপি