
হরমুজ প্রণালী দিয়ে আবারও জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কয়েকদিনের উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার পর এমন মন্তব্য করলেন তিনি, যখন ওই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
সোমবার এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ‘জাহাজগুলো চলাচল শুরু করেছে, এর মধ্যে অনেকগুলো তেলবোঝাই জাহাজও রয়েছে, যা হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করছে।’
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও লেখেন, ‘জাহাজগুলো দক্ষিণের ‘হাইওয়ে’ দিয়ে চলাচল করছে, যা সম্পূর্ণ নিরাপদ, সুরক্ষিত এবং নির্বিঘ্ন।’ একই সঙ্গে তিনি ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি নৌপথের কথা উল্লেখ করেন এবং বলেন, ‘চলাচলের জন্য আরও কিছু পথও রয়েছে।’
তবে একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া এক পরামর্শবার্তায় বলা হয়েছে, শুক্রবার নির্ধারিত স্বাক্ষর অনুষ্ঠান না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ বহাল থাকবে। সেখানে সতর্ক করে বলা হয়, ‘ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশ ও বের হওয়া সব ধরনের নৌযান চলাচলের ওপর সামরিক অবরোধ কার্যকর রয়েছে। স্পষ্ট নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত কেউ পারাপারের চেষ্টা করবেন না।’
এদিকে হরমুজ প্রণালী ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে। প্রাথমিক সমঝোতার আওতায় প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং সব ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধের কথা বলা হলেও চূড়ান্ত চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখনো প্রকাশ হয়নি।
চুক্তির আওতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, মধ্যপ্রাচ্যে তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন, জব্দকৃত সম্পদ ফেরত এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো জটিল বিষয়গুলো ৬০ দিনের আলোচনায় নিষ্পত্তির জন্য রাখা হয়েছে।
স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় লাগবে
সম্ভাব্য সমঝোতার খবরে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে।
শিপিং ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা খাতের কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়েছে, মাইন অপসারণ শেষ হতে ৪০ থেকে ৫০ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এরপরই বিমা ও জাহাজ পরিবহন কোম্পানিগুলো আস্থা ফিরে পাবে। তবে কিছু কোম্পানি এর আগেই চলাচল শুরু করার ইঙ্গিত দিয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব শিপিং জানিয়েছে, বর্তমানে প্রায় ৫০০ জাহাজ প্রণালী পার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে এবং প্রায় ২০ হাজার নাবিক বিভিন্ন জাহাজে আটকা পড়ে আছেন।
ট্রাম্প আরও জানান, তিনি সোমবার ফ্রান্সে শুরু হওয়া জি-৭ সম্মেলনে মাইন অপসারণ কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করবেন।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা জানিয়েছে, সংঘাত চলাকালে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মোট ৪৬টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
তবে এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি
হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর পরিকল্পনার বিস্তারিত এবং ভবিষ্যতে এই জলপথের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সংঘাত প্রমাণ করেছে যে এই প্রণালী ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার। তেহরান চাইলে এটি বন্ধ বা জাহাজ চলাচলের ওপর ফি আরোপ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, তিনি আশা করেন দীর্ঘমেয়াদে প্রণালীটি ‘কোনো ধরনের টোল ছাড়াই’ উন্মুক্ত থাকবে এবং বিষয়টি কারিগরি আলোচনায় নিষ্পত্তি হবে।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি নেওয়া হতে পারে। তিনি বলেন, ‘এই জলপথে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার জন্য আমাদের কিছু সময় প্রয়োজন।’
এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেডি ভ্যান্স দাবি করেন, সমঝোতা স্মারকটি ইতোমধ্যে রোববার ডিজিটালভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। ফলে শুক্রবার আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের আগে চুক্তির শর্তগুলোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।