
ভয়াবহ তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ফ্রান্স। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে রেকর্ড ভাঙা তাপমাত্রা অব্যাহত থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে, আর পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনাও বেড়েছে। আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন, বুধবার দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে।
ফ্রান্সের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা মেতেও ফ্রান্স জানিয়েছে, দেশের অর্ধেকেরও বেশি এলাকা বর্তমানে সর্বোচ্চ মাত্রার ‘লাল সতর্কতা’র আওতায় রয়েছে। চলমান দাবদাহকে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ তাপপ্রবাহ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার ফ্রান্সে নতুন উষ্ণতার রেকর্ড গড়ে ওঠে। সেদিন দেশজুড়ে গড় তাপমাত্রা ছিল ২৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই দিনে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লান্দেস বিভাগের পিসোস এলাকায় পারদ ওঠে ৪৪ দশমিক ৩ ডিগ্রিতে। এর আগের রাতটিও ছিল দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ রাত; সারা দেশে গড় তাপমাত্রা ছিল ২৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
তীব্র গরমের প্রভাবে পশ্চিমাঞ্চলীয় ব্রিট্টানি অঞ্চলে প্রায় ৬৮ হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আরও সময় লাগতে পারে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় শহর লা রোশেলে বুধবার ভোর ৫টাতেই তাপমাত্রা ছিল ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্যারিস থেকে ব্রিট্টানি পর্যন্ত বিস্তৃত পশ্চিমাঞ্চলের বহু এলাকায় তাপমাত্রা ৩৯ থেকে ৪০ ডিগ্রির মধ্যে অবস্থান করছে এবং সপ্তাহান্ত পর্যন্ত এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে।
এদিকে বোর্দো শহরে টানা তৃতীয় দিনের মতো সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে শহরটিতে ৪১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়েছিল। কিন্তু চলতি সপ্তাহে সোমবার তাপমাত্রা পৌঁছায় ৪১ দশমিক ৮ ডিগ্রিতে এবং মঙ্গলবার তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ দশমিক ১ ডিগ্রিতে।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, শুক্রবার থেকে তাপমাত্রা কিছুটা কমতে পারে। তবে এর সঙ্গে বজ্রঝড়, আকস্মিক বন্যা ও বড় আকারের শিলাবৃষ্টির ঝুঁকিও বাড়বে।
ফ্রান্সের শ্রমমন্ত্রী জঁ-পিয়েরে ফারান্দো এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমরা এখন বুঝতে পারছি যে আমরা একটি উষ্ণ দেশে পরিণত হয়েছি।” তিনি নতুন জলবায়ুগত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সমাজকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান।
দাবদাহের প্রভাব পড়েছে দেশের পর্যটন খাতেও। অতিরিক্ত গরমের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থী সমাগম হওয়া জাদুঘর লুভর নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কর্তৃপক্ষের মতে, ঐতিহাসিক ভবনটি চরম তাপমাত্রা মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট উপযোগী নয়। একই কারণে আইফেল টাওয়ারের কার্যক্রমও সীমিত করা হয়েছে।
ফরাসি প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া তাপপ্রবাহের সময়কালে পানিতে ডুবে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ছয় বছর বয়সী এক শিশু এবং ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীও রয়েছে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বনাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মেইন-এট-লোয়ার অঞ্চলের একটি বনাঞ্চলে আগুন নিয়ন্ত্রণে ১৫০ জনের বেশি দমকলকর্মীকে কাজ করতে হয়েছে।
ফ্রান্সের পাশাপাশি ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ একই ধরনের তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হয়েছে। নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, স্পেন ও ইতালিতে বিভিন্ন মাত্রার আবহাওয়া সতর্কতা জারি রয়েছে। কয়েকটি দেশে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ুবিষয়ক সংস্থা কোপার্নিকাস জানিয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব ইউরোপে সবচেয়ে দ্রুত অনুভূত হচ্ছে। বিশ্বের গড় উষ্ণতার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে উত্তপ্ত হচ্ছে মহাদেশটি। ফলে দাবদাহ, খরা ও ভয়াবহ দাবানলের মতো চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি ক্রমেই বাড়ছে।