
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যে অংশ নিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে তেহরান। তবে আমন্ত্রণ গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান—দুই ক্ষেত্রেই ভারতের জন্য নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ভারতের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভারসাম্য রক্ষা করা।
ভারতের জন্য বিষয়টি স্পর্শকাতর, কারণ ইরান দেশটির গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও জ্বালানি অংশীদার। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বর্তমানে ভারতের প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত সহযোগিতার অন্যতম প্রধান মিত্র।
এ অবস্থায় খামেনির শেষকৃত্যে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠানো হলে তা ইরানের প্রতি সমর্থনের বার্তা হিসেবে দেখা হতে পারে। আবার প্রতিনিধি না পাঠালে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটার আশঙ্কাও রয়েছে।
ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর একটি হলো চাবাহার বন্দর। এই বন্দরের মাধ্যমে পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায় নয়াদিল্লি।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি ইরানের অবস্থান ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা ভারতের লাখো প্রবাসী কর্মী এবং বাণিজ্যিক স্বার্থের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে ওয়াশিংটন এখন নয়াদিল্লির অন্যতম ঘনিষ্ঠ অংশীদার।
একইভাবে ইসরায়েল ভারতের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশ। ফলে খামেনির শেষকৃত্যে ভারতের উচ্চপর্যায়ের অংশগ্রহণ ওয়াশিংটন ও তেলআবিবে ভিন্ন বার্তা দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিজে ইরান সফরে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে ভারত একজন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে।
এর আগে ২০২৪ সালে ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুতে ভারত একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছিল এবং তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়কে শেষকৃত্যে পাঠিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, মোদি নিজে না গেলেও একজন জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি পাঠানোর সম্ভাবনাই বেশি। এতে একদিকে ইরানের প্রতি কূটনৈতিক সম্মান দেখানো হবে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কেও বড় ধরনের অস্বস্তি তৈরি হবে না।
সব মিলিয়ে খামেনির শেষকৃত্যে অংশগ্রহণের বিষয়টি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি ভারতের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নয়াদিল্লির সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হবে, এই জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণে ভারত কোন পথ বেছে নেয়।