
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আরও কঠোর অবস্থান নিল ইরান। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে তেহরান জানিয়েছে, কৌশলগত এই জলপথে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে তারা।
বুধবার (১৫ জুলাই) ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএর বরাতে দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকামিনিয়া বলেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার বিষয়ে তেহরানের অবস্থান একেবারেই স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘আমরা শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যাব এবং এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হস্তক্ষেপ নিষ্ক্রিয় করে দেব।’
আইআরএনএর এক্স পোস্টে আরও দাবি করা হয়, নির্দিষ্ট কয়েকটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব বলে যুক্তরাষ্ট্র যে ধারণা করছে, তা বাস্তবসম্মত নয়। সংস্থাটির ভাষ্য, উপকূল বা দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান যেমনই হোক, এই প্রণালিতে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার সক্ষমতা ইরানের রয়েছে।
এর আগে বুধবার ইরানের বিভিন্ন বন্দরের বিরুদ্ধে আবারও নৌ অবরোধ আরোপের পর দেশটির উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় দুই দফা হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান সংঘাতকে ‘অস্তিত্বের যুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে তেহরান।
কয়েক দিন আগে ভেঙে যাওয়া নাজুক যুদ্ধবিরতির পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে। এরপর আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দেয় ইরান। শনিবার রাতে প্রণালিটি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। সাম্প্রতিক সংকটের প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে। বুধবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম এক মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে প্রতি ব্যারেল ৮৪ দশমিক ৯৫ ডলারে পৌঁছায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, বুধবার সকালে ইরানের গ্রেটার তুনব দ্বীপে উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের গুদাম এবং উৎক্ষেপণ কেন্দ্র লক্ষ্য করে প্রথম দফা হামলা চালানো হয়। প্রায় নয় ঘণ্টা পর দ্বিতীয় দফায় দেশটির একাধিক শহরে আরও হামলা চালানো হয়।
সেন্টকমের দাবি, অভিযানে ইরানের কমান্ড সেন্টার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এবং উপকূলীয় নজরদারি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির তীরবর্তী বন্দর আব্বাসে নৌবাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) বিভিন্ন স্থাপনাতেও হামলা চালানো হয়েছে।
অন্যদিকে আইআরজিসি জানিয়েছে, বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। বাহিনীটির দাবি, কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটির একটি রাডার ব্যবস্থা এবং সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের সমাবেশও হামলার লক্ষ্য ছিল।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে তিনজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার পাশাপাশি ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করাও এই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি হিসেবেও এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে তারা জানান।
মার্কিন সামরিক বাহিনী আরও দাবি করেছে, ইরানের খার্গ দ্বীপের দিকে অগ্রসর হওয়া একটি খালি তেলবাহী জাহাজ একাধিক সতর্কবার্তা অমান্য করায় সেটির দিকে হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। মঙ্গলবার থেকে নতুন করে নৌ অবরোধ শুরুর পর দুটি জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন এবং একটি জাহাজ অচল করে দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে তারা।
এদিকে ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বন্দর আব্বাসসহ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণ ঘটেছে। একই সঙ্গে আহভাজ, কোনারাক, সিরিক ও কেশম এলাকাতেও বিস্ফোরণ ও গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন প্রেস টিভির তথ্য অনুযায়ী, তেহরান থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে খন্দাব শহরেও অন্তত দুটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে রাজধানী তেহরানে সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মেহর বার্তা সংস্থা।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি দাবি করেছে, আহভাজে শিশু ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র থাকা একটি হাসপাতালের কাছাকাছি মার্কিন হামলা হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে হাসপাতালটি সাময়িকভাবে খালি করে শিশু রোগীদের পরিবারসহ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
প্রথম দফা হামলার পর ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখা দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরান এখন একটি ‘অস্তিত্বের যুদ্ধে’ রয়েছে।’
চলমান সংঘাতে ইতোমধ্যে হাজারো মানুষের প্রাণহানি এবং লাখো মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরান ও লেবানন। একই সময়ে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তাসনিম বার্তা সংস্থার বরাতে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুধু জুলাই মাসেই মার্কিন হামলায় অন্তত ৩৫ জন নিহত হয়েছেন।