
পারস্য উপসাগরের কৌশলগত জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজে উপর্যুপরি হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ভারত। এ ঘটনার জেরে নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত ইরানের উপ-রাষ্ট্রদূতকে জরুরি তলব করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, উদ্ভূত ভূরাজনৈতিক সংকট ও ঝুঁকিপূর্ণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে জাহাজমালিক, পরিচালনাকারী সংস্থা এবং ক্রু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী কোনো জাহাজে ভারতীয় নাবিক মোতায়েন না করার কড়া নির্দেশ দিয়েছে ভারত সরকার।
ওমান জলসীমায় তেলবাহী জাহাজে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত
ভারতের সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) তথ্য দিয়েছে যে—গত রবিবার ওমানের জলসীমার অন্তর্গত হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ নৌপথে তাদের পতাকাবাহী ‘মোম্বাসা’ এবং ‘আল বাহিয়াহ’ নামের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এই ভয়াবহ বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই এক ভারতীয় নাবিক প্রাণ হারান এবং আরও আটজন ক্রু সদস্য আহত হন।
ইউএই প্রশাসন আরও স্পষ্ট করেছে যে, হামলায় আহত আটজনের মধ্যে ছয়জন ভারতের এবং বাকি দুজন ইউক্রেনের নাগরিক। চিকিৎসাধীন আহতদের মধ্যে চারজন নাবিকের অবস্থা এখনও অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
ওমান রুটে মার্কিন সহায়তার অভিযোগ আইআরজিসি-র
এই হামলার পর ইরানের এলিট ফোর্স ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, ওয়াশিংটন আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালির ওমান-সংলগ্ন অংশে একটি ‘অবৈধ রুট’ ব্যবহার করে যাতায়াতে প্ররোচিত ও সহায়তা করছে। আইআরজিসি-র দাবি, ওই নির্দিষ্ট নৌপথটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং সেখানে সামরিক মাইন পেতে রাখা হয়েছে।
এই ঘটনার পরদিনই নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরে ইরানের উপ-মিশনপ্রধান ও উপ-রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জাওয়াদ হোসেইনিকে তলব করে ভারত সরকার তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
ভারতীয় নাবিকদের সুরক্ষায় কড়া নিষেধাজ্ঞা ও 'সিফেয়ারার-ফার্স্ট' উদ্যোগ
ভারতের নৌপরিবহন মহাপরিদপ্তর (ডিজিএস) এক জরুরি নির্দেশনায় জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটায় ভারতীয় ক্রুদের জীবন রক্ষার্থে অতিরিক্ত সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে। এ কারণে পরবর্তী ঘোষণা না আসা পর্যন্ত এই রুট দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে ভারতীয় জনবল নিয়োগ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে। উল্লেখ্য, এই নিষেধাজ্ঞা জারির ঠিক আগেই চলতি সপ্তাহে হরমুজ প্রণালির সংলগ্ন এলাকায় পৃথক দুটি হামলায় আরও দুই ভারতীয় নাবিক নিহত হন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারত সরকারের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগরে চলাচলকারী যেকোনো দেশের পতাকাবাহী জাহাজে কর্মরত ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে গত সোমবার ‘সিফেয়ারার-ফার্স্ট’ নামে একটি জরুরি সুরক্ষা কার্যক্রমের ঘোষণা দেন ভারতের নৌপরিবহনমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল। এদিকে মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে একের পর এক আক্রমণকে ‘গভীর উদ্বেগজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর ১৪ নাবিকের মৃত্যু
জাতিসংঘের গত মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি ও এর পার্শ্ববর্তী জলসীমায় বিভিন্ন হামলায় অন্তত ১৪ জন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন। এই নিহতদের তালিকায় গত ৯ জুন ওমান উপকূলে ‘সেত্তেবেল্লো’ নামক তেলবাহী ট্যাংকারে মার্কিন হামলায় নিহত তিন ভারতীয় নাবিকও রয়েছেন।
সরকারি হিসাব মতে, বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক জাহাজে নাবিক বা ক্রু সরবরাহের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান তৃতীয়। বর্তমানে দেশটির তিন লাখেরও বেশি দক্ষ নাবিক আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমার বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজে কর্মরত রয়েছেন, যার ফলে এই রুট বন্ধ হওয়া বিশ্ব বাণিজ্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।