
জনপরিসরে যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা কিংবা দেওয়ালের আড়ালে প্রকাশ্যে প্রস্রাব করার অভ্যাস রুখতে এক নজিরবিহীন ও কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে ভারতের আসাম রাজ্যের তিনসুকিয়া পৌরসভা। শহরের বিভিন্ন স্থানে বসানো সিসিটিভি ক্যামেরায় নিয়মভঙ্গকারীদের দৃশ্য ধারণ করে তা সরাসরি প্রদর্শিত হচ্ছে বড় বড় এলইডি স্ক্রিনে। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার লক্ষ্যে নেওয়া পৌরসভার এই ভিন্নধর্মী উদ্যোগটি এখন পুরো ভারতজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। খবর এনডিটিভির।
জাতীয় স্তরে এই বিষয়টি প্রথম আলোড়নে আসে যখন রাজ্যসভার সদস্য মিলিন্দ দেওরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) ‘হল অব শেম’ বা লজ্জার তালিকা শিরোনামে এই ব্যতিক্রমী অভিযানের কথা শেয়ার করেন। তিনি মুম্বাইয়ের মতো মেগাসিটিসহ দেশের অন্যান্য প্রধান শহরগুলোতেও জনপরিসর পরিচ্ছন্ন রাখতে এমন উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন।
উদ্দেশ্য কাউকে অপমান করা নয়: পৌর চেয়ারম্যান
জনসমক্ষে এভাবে ছবি প্রচারের ফলে বিতর্ক তৈরি হলেও তিনসুকিয়া পৌর বোর্ডের চেয়ারম্যান পুলক চেটিয়া এই পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন:
"অভিযানের উদ্দেশ্য কাউকে অপমান করা নয়; বরং নাগরিকদের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা।"
চেয়ারম্যানের ভাষ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালিয়েও জনসমক্ষে থুথু ফেলা, প্রস্রাব করা ও যত্রতত্র ময়লা ফেলার মানসিকতা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি। শহরে পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট এবং অর্থের বিনিময়ে তা ব্যবহারের সুব্যবস্থা থাকার পরেও সাধারণ মানুষের একাংশ নিয়ম ভাঙছিল। আর সে কারণেই বাধ্য হয়ে এই কড়া কৌশল বেছে নিয়েছে পৌরসভা।
পুলক চেটিয়া আরও জানান, শহরের যেসব স্পর্শকাতর স্থানে এই অপরাধগুলো বেশি ঘটে, সেখানে কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। এই প্রচারণার কারণে কোনো ব্যক্তি যদি প্রকাশ্যে নোংরা করার আগে দ্বিতীয়বার ভাবেন, তবেই পৌরসভার এই খাটুনি ও উদ্যোগ সফল হবে বলে তিনি মনে করেন। দেশজুড়ে নাগরিক পরিচ্ছন্নতা নিয়ে এই আলোচনার সূত্রপাত হওয়াটাকেও তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
পর্যাপ্ত শৌচাগার ও পরিকাঠামোর দাবি নাগরিকদের
পৌরসভার এই 'ডিজিটাল শাস্তি' নিয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে অবশ্য মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অনেকে এই অভিনব উদ্যোগের প্রশংসা করলেও, এর সমান্তরালে পর্যাপ্ত গণশৌচাগার ও উন্নত নাগরিক অবকাঠামো নিশ্চিতের দাবি তুলেছেন।
শহরের একজন বাসিন্দার ভাষ্য:
"জনসমক্ষে নোংরা করার আগে মানুষকে ভাবতে বাধ্য করবে এই উদ্যোগ। তবে এর পাশাপাশি সহজলভ্য গণশৌচাগার নিশ্চিত করাও জরুরি।"
নাগরিকদের এই দাবির প্রেক্ষিতে পৌর চেয়ারম্যান পুলক চেটিয়া আশ্বস্ত করে বলেন, শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে ইতিমধ্যে গণশৌচাগার সচল রয়েছে এবং নতুন করে আরও টয়লেট নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন যে, কেবল অবকাঠামো বা শৌচাগার বানালেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না; এর জন্য নাগরিকদের নিজস্ব সচেতনতা ও সর্বাত্মক সহযোগিতা সমানভাবে জরুরি।
তিনসুকিয়া পৌরসভার এই ব্যতিক্রমী পদক্ষেপকে কেউ কেউ নাগরিক আচরণ সংশোধনের জুতসই কৌশল হিসেবে স্বাগত জানাচ্ছেন, আবার সমালোচকদের মতে, এভাবে জনসমক্ষে কারও ছবি টাঙিয়ে দেওয়ার আগে প্রতিটি কোণায় পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা ও শৌচাগার নিশ্চিত করা প্রশাসনের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল।