
ভারতের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডর, যা ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত, তার নিরাপত্তা জোরদারে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে নয়াদিল্লি। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের একমাত্র স্থল সংযোগ হওয়ায় করিডরটির নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে কেন্দ্রীয় সরকার। এ প্রেক্ষাপটে সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যালোচনায় শিলিগুড়ি সফরে যাচ্ছেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
শনিবার (১৮ জুলাই) উত্তরকন্যায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শাখা সচিবালয়ে অনুষ্ঠিতব্য উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নিরাপত্তা বাহিনী, রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেবেন। বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং রাজ্য মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যও উপস্থিত থাকতে পারেন।
প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ শিলিগুড়ি করিডর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে। নেপাল ও বাংলাদেশের মাঝামাঝি অবস্থিত এই করিডরের সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার। ভারত-চীন-ভুটান সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির নিরাপত্তা পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে।
ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের অগ্রগতি, বিশেষ করে শিলিগুড়ি করিডরসংলগ্ন সীমান্তের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনী, রাজ্য প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদারের বিষয়ে নির্দেশনা দিতে পারেন অমিত শাহ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে করিডরটির নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও চীনকে ঘিরে বিভিন্ন কৌশলগত অগ্রগতি এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প নয়াদিল্লির নিরাপত্তা পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের লালমনিরহাটের পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি উন্নয়নের পরিকল্পনা করছে। বিমানঘাঁটিটি শিলিগুড়ি করিডর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
এ ছাড়া সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনায় দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সিকিম থেকে উৎপন্ন হয়ে শিলিগুড়ি করিডর অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করা তিস্তা নদীর অববাহিকার কাঠামো পুনর্গঠন করা হবে। এক পর্যবেক্ষকের ভাষ্য অনুযায়ী, কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডরের এত কাছাকাছি এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ভারতের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারে বিএসএফের কাছে জমি হস্তান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের দাবি, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও নজরদারি অবকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
শুধু সীমান্ত নিরাপত্তাই নয়, শিলিগুড়ি করিডরের যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নেও জোর দিয়েছে ভারত সরকার। অতিরিক্ত রেললাইন নির্মাণ, ভূগর্ভস্থ রেলপথ, বাগডোগরা বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন এবং ভারতীয় বিমানবাহিনীর রাফাল স্কোয়াড্রন থাকা হাসিমারা বিমানঘাঁটির উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজও চলছে।
সফরসূচি অনুযায়ী, শুক্রবার রাতে শিলিগুড়িতে পৌঁছে বিএসএফের উত্তরবঙ্গ ফ্রন্টিয়ার সদর দপ্তরে অবস্থান করবেন অমিত শাহ। শনিবার তিনি একটি সীমান্ত চৌকি পরিদর্শন করবেন, বিএসএফ সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন এবং কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।
এরপর উত্তরকন্যায় একাধিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তার। বৈঠকগুলোর একটিতে পশ্চিমবঙ্গে নতুন ‘গুন্ডা আইন’-এর বাস্তবায়নের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হবে। বিশ্লেষকদের মতে, শিলিগুড়িতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে এই উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা বৈঠক করিডরটির কৌশলগত গুরুত্বেরই প্রতিফলন।