
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পৃক্ততা নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী প্রচারণায় যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন এমন এক সংঘাতের দিকে এগোচ্ছেন, যা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি ‘অনন্ত যুদ্ধে’ জড়িয়ে ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র একাধিক দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানে জড়িয়েছে। শুরুতে দ্রুত সাফল্যের আশা করা হলেও পরে রাজনৈতিক চাপ, বিপুল ব্যয় ও দীর্ঘ সংঘাতের কারণে পরবর্তী প্রশাসনগুলোকে সেনা প্রত্যাহার করতে হয়েছে।
ইরান সংকটেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা। নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এড়িয়ে চলার অঙ্গীকার করলেও ইরানকে কেন্দ্র করে তার নীতিতে সেই অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের ঘোষিত দুটি প্রধান লক্ষ্য, ইরানের সরকার পরিবর্তন কিংবা দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। বরং যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ট্রাম্প যে সমঝোতা স্মারকের কথা তুলে ধরে লক্ষ্য অর্জনের দাবি করেছিলেন, সেটিও এক মাসের মধ্যেই কার্যকারিতা হারিয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো ওই সমঝোতার ব্যাখ্যায় ভিন্ন অবস্থান নেওয়ায় সংকট আরও গভীর হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভাইজ বলেন, উভয় পক্ষই সমঝোতা স্মারককে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ হিসেবে দেখেনি। বরং তারা এটিকে সংঘাত অব্যাহত রাখার ভিন্ন একটি উপায় হিসেবে বিবেচনা করেছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কৌশল ছাড়া এই সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে ‘অনন্ত যুদ্ধে’ রূপ নেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘অনন্ত যুদ্ধ’ ধারণাটি মূলত ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধ’ থেকে আলোচনায় আসে। আফগানিস্তান ও ইরাকে সরকার পরিবর্তনের পরও বিদ্রোহ দমন এবং স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর সামরিকভাবে জড়িয়ে থাকে। বিপুল অর্থব্যয় ও প্রাণহানির পরও কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জিত হয়নি।
যুদ্ধবিশেষজ্ঞ লরেন্স ডি. ফ্রিডম্যান বলেন, বড় শক্তিগুলো প্রায়ই দ্রুত বিজয়ের প্রত্যাশা করে যুদ্ধে নামে। কিন্তু সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করায় সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়।
তার মতে, ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প এবং ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন উভয়েই এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, যা দ্রুত অর্জন করা বাস্তবে সম্ভব ছিল না।
ফ্রিডম্যান আরও বলেন, কেবল সামরিক সক্ষমতা দিয়ে যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান হয় না। যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্যকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অর্জনে রূপ দিতে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এই চ্যালেঞ্জ আরও বড়, কারণ তিনি স্থলবাহিনী মোতায়েন না করে মূলত বিমান ও নৌবাহিনীর ওপর নির্ভর করছেন।
বিশ্লেষকরা ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের উদাহরণ টেনে বলেন, সে সময় প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের লক্ষ্য ছিল সীমিত এবং স্পষ্ট। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাক ও আফগানিস্তানে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পথে হাঁটেন, যার ফল প্রত্যাশামাফিক হয়নি। শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তানে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসে এবং ইরাকে সংঘাত-পরবর্তী পরিস্থিতি ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়িয়ে দেয়।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ইসরায়েলের প্ররোচনায় ট্রাম্প ধীরে ধীরে আরও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছেন। এই সংঘাত এখন লেবানন, ফিলিস্তিন ও ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমেও বিস্তৃত হয়েছে।
তার মতে, ট্রাম্প চাইলে এখনো এ সংঘাতকে রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরে সরে আসতে পারেন। কিন্তু তিনি উল্টো আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হচ্ছেন, অথচ স্থায়ী শান্তির কোনো স্পষ্ট রূপরেখা সামনে আনতে পারেননি।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, হরমুজ প্রণালি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিপরীতমুখী অবস্থান ভবিষ্যতে দীর্ঘ সামরিক উত্তেজনার বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল অব্যাহত রাখতে চায়, সেখানে ইরান কৌশলগত এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি নয়।
তারা আরও বলেন, ইরান যুদ্ধ আফগানিস্তান বা ইরাকের মতো নয়। এখানে যুক্তরাষ্ট্র কোনো দুর্বল রাষ্ট্র নয়, বরং সামরিক ও কৌশলগতভাবে সক্ষম একটি দেশের মুখোমুখি। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার সক্ষমতা ইরানের হাতে থাকায় বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিও বড় ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বৈদেশিক নীতি বিভাগের পরিচালক সুজান মালোনি বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা এখন অত্যন্ত ক্ষীণ। তার মতে, ইরাক যুদ্ধের মতো এবারও মার্কিন নীতিনির্ধারকদের ভুল হিসাব মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এনে দিয়েছে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে হতে পারে, যা অঞ্চলটিকে নতুন এক নিরাপত্তা বাস্তবতায় নিয়ে যাবে।
অন্যদিকে আলী ভাইজের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত যুদ্ধের অবসান হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ, দুই পক্ষ একটি সমঝোতাও টিকিয়ে রাখতে পারেনি। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ একসময় দীর্ঘস্থায়ী ও স্থায়ী যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।