
ইরানের সঙ্গে চলমান মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাত, দেশের কৃষকদের আর্থিক সাহায্য এবং জাতীয় নির্বাচন ব্যবস্থায় বিতর্কিত সংস্কার নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্য সামনে রেখে ৯৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এক বিশাল বাজেট রূপরেখা অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস)। বুধবার আইনপ্রণেতাদের তুমুল বাদানুবাদের পর ২১৬-২১৪ ভোটের ন্যূনতম ব্যবধানে পাস হওয়া এই প্রস্তাবিত বিলটি এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মার্কিন সিনেটে পাঠানো হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এপি-র বরাতে জানা গেছে, অনুমোদিত এই বাজেটের সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৭৩ বিলিয়ন ডলার রাখা হয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ব্যয় বাবদ। এই অর্থ প্রধানত ইরান যুদ্ধে সামরিক বাহিনীর খরচ মেটানো, মার্কিন অস্ত্রের ঘাটতি পূরণ এবং অত্যন্ত গোপনীয় নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবহৃত হবে। এছাড়া জাতীয় বাজেটের বাকি অংশের মধ্যে কৃষি খাতের সহায়তায় ১২ বিলিয়ন ডলার এবং দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার কাঠামো পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে ১০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে।
নির্বাচনী বাজেটের এই ১০ বিলিয়ন ডলার মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ভোটাধিকার সংক্রান্ত নতুন নীতি বাস্তবায়নে খরচ হবে। এই নিয়মে ভোটার তালিকায় নাম নিবন্ধনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নাগরিকত্বের লিখিত প্রমাণ দেখানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দলের দাবি— নতুন এই পদক্ষেপে নির্বাচনে যেকোনো কারচুপি রোধ হবে। যদিও বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, কঠোর এই শর্তের কারণে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বয়স্ক নাগরিক এবং বিবাহিত নারীদের ভোট দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
জাতীয় এই বাজেট প্রস্তাব পাসের পরপরই মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন জানান:
"কংগ্রেসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর দুটি হলো দেশের নিরাপত্তা ও নির্বাচন রক্ষা।"
তাঁর মতে, নতুন পরিকল্পনাটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভিত্তি সুদৃঢ় করার পাশাপাশি সামগ্রিক নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বস্ততা বাড়াবে।
চলতি সপ্তাহেই হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে শীর্ষ রিপাবলিকান নীতিনির্ধারকদের এক বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকের পরেই দ্রুততম সময়ে এই বাজেট পরিকল্পনা বিল আকারে টেবিলে আনার গতি বৃদ্ধি পায়। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী বছরের বহুল প্রতীক্ষিত মধ্যবর্তী নির্বাচনের (মিডটার্ম ইলেকশন) আগে রাজনৈতিক মাঠ নিজেদের দখলে রাখতে এটি রিপাবলিকানদের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি হতে যাচ্ছে।
তবে বিশাল অঙ্কের এই সামরিক ও নির্বাচনী বাজেট ঘিরে ক্যাপিটল হিলে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতারা। প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট দলের নেত্রী রোসা ডেলাউরো তীব্র সমালোচনা করে বলেন:
"মার্কিন জনগণ বিদেশে যুদ্ধ নয়; বরং খাদ্য, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিশুযত্ন ও জ্বালানির দাম কমাতে সরকারি উদ্যোগ চায়।"
তিনি সতর্ক করে বলেন, এই বিশাল বাজেট অনুমোদনের অর্থ হলো ট্রাম্প প্রশাসনকে ইরানে এক অর্থহীন, অমূল্যায়নযোগ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার জন্য উন্মুক্ত চেক বই উপহার দেওয়া।
একই সুরে হাউস বাজেট কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য ব্রেন্ডন বয়েল মন্তব্য করেন, মার্কিন সাধারণ করদাতাদের কষ্টার্জিত অর্থ জনসমর্থনহীন এক অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে ঢালা হচ্ছে, যার ফলে দেশের ওপর ঋণের পাহাড় তৈরি হবে।
পাল্টা যুক্তিতে রিপাবলিকানদের দাবি— ইরানের বিরুদ্ধে একটানা সামরিক অভিযানের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, বৈশ্বিক বাস্তবতায় দ্রুততার সাথে তা পুনর্গঠন করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে পাস হওয়া এই ৯৫ বিলিয়ন ডলারের বিলটি প্রাথমিক বাজেট রূপরেখা মাত্র। সিনেট থেকে চূড়ান্ত সায় মিললে তবেই বিস্তারিত বিল প্রণয়ন করা হবে। তবে সিনেটের প্রচলিত ৬০ ভোটের বাধা এড়াতে রিপাবলিকানরা বিশেষ 'বাজেট সমন্বয়' (রিকনসিলিয়েশন) কৌশলের আশ্রয় নিতে চাইছে, যাতে কেবল সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৫০+১ ভোট) পেলেই বিলটি আইনে পরিণত হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধের ব্যয় মেটানো, কৃষক তোষণ এবং ভোটার নিবন্ধন আইন কঠোর করার এই ত্রিফলা কৌশল কাজে লাগিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও রিপাবলিকান দল মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে চাচ্ছে।