
ইরানের পক্ষ থেকে হত্যার হুমকি পাওয়ার পর গত মাসে তুরস্ক থেকে গোপনে সামরিক বিমানে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওই সময় হোয়াইট হাউস জানিয়েছিল, ট্রাম্প পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানেই যুক্তরাষ্ট্রে ফিরছেন। তবে বাস্তবে তাকে বিমানবন্দরের একটি ক্যাটারিং ট্রাকে করে অন্য একটি ছোট সামরিক বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
ন্যাটো সম্মেলনে অংশ নিতে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় গিয়েছিলেন ট্রাম্প। ওই সফরেই প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক যাত্রায় কাতারের উপহার দেওয়া নতুন উড়োজাহাজটি ব্যবহার করা হয়। তবে আঙ্কারা ছাড়ার সময় হঠাৎ করেই পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প। এর ফলে নতুন উড়োজাহাজটির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যেই ট্রাম্পের তুরস্ক সফর অনুষ্ঠিত হয়। দেশটির সঙ্গে ইরানের সীমান্তও রয়েছে।
আঙ্কারা ছাড়ার আগে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে জানান, তিনি ‘পুরোনো দিনের কথা মনে করে’ পুরোনো নীল রঙের এয়ারফোর্স ওয়ানে করে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্স মাইল্ডেনহলে যাবেন। একই সময়ে কাতারের দেওয়া নতুন উড়োজাহাজটিও সেখানে যাবে, যাতে ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন সেনারা সেটি ঘুরে দেখতে পারেন। পরে জানা যায়, এই ঘোষণা ছিল নিরাপত্তা পরিকল্পনারই অংশ।
আঙ্কারায় ক্যামেরার সামনে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানে ওঠেন ট্রাম্প। এরপর গোপনে বিমানবন্দরের একটি ক্যাটারিং ট্রাকে করে তাকে অপেক্ষমাণ ছোট একটি সামরিক বিমানে নিয়ে যাওয়া হয়। বিমানটি ছিল মার্কিন বিমানবাহিনীর সি৩২-এ। একজন মার্কিন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের বরাতে এ তথ্য জানা যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পকে হত্যার একটি বিশ্বাসযোগ্য হুমকি পাওয়ার পরই এই গোপন অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানকে কার্যত ট্রাম্পের ‘ডিকয়’ বা বিভ্রান্তিমূলক বিমান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
ট্রাম্পের সঙ্গে ভ্রমণ করছেন বলে ধারণা করা সাংবাদিকেরাও পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানেই ছিলেন। হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মীও মনে করেছিলেন, প্রেসিডেন্ট ওই বিমানেই অবস্থান করছেন। এ সময় সাংবাদিকদের বিমানের প্রেস কেবিনের জানালার পর্দা বন্ধ রাখতে বলা হয়।
পরে সাংবাদিকেরা জানতে চান, কেন তাদের জানালার পর্দা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘সম্ভবত আমরা একটি বিপজ্জনক ফ্লাইটে ছিলাম।’ এরপর তিনি বলেন, ‘তবে আমি গেলে আপনারাও যাবেন, তাই না?’
ট্রাম্পকে বহনকারী সি৩২-এ যুক্তরাজ্যে গিয়ে স্থানীয় সময় রাত প্রায় ১০টা ২০ মিনিটে অবতরণ করে। এর কয়েক মিনিট পর পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানও সেখানে পৌঁছায়। তবে ট্রাম্প কখন এবং কীভাবে সি৩২-এ থেকে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানে ফিরে যান, তা স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্পের সফরসঙ্গী সাংবাদিকেরা জানান, যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৫৬ মিনিটে তিনি পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামেন। এ সময় সাংবাদিকদের দিকে শান্তির প্রতীক হিসেবে দুই আঙুল তুলে ইশারা করলেও তাদের সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে যাননি। পরে কিছু সময় মার্কিন সেনাসদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করে তিনি কাতারের দেওয়া নতুন উড়োজাহাজটির দিকে যান।
ট্রাম্পের গোপন তৃতীয় বিমানে যাত্রার বিষয়ে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক স্টিভ চেউং বলেন, কাতারের দেওয়া উড়োজাহাজটিতে প্রেসিডেন্ট ও তার কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি যেমন বলেছেন, আমেরিকার অনেক শত্রু তাকে লক্ষ্য করছে। এসব হুমকি মোকাবিলায় আমাদের হাতে থাকা সব ধরনের ব্যবস্থা আমরা ব্যবহার করি।’
হোয়াইট হাউসও একই বক্তব্য জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে পেন্টাগন তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
কাতারের দেওয়া নতুন উড়োজাহাজটি একটি বোয়িং ৭৪৭। ট্রাম্পের পছন্দ অনুযায়ী এতে লাল, সাদা, গাঢ় নীল ও সোনালি রঙের নকশা করা হয়েছে। গত বছর কাতার যুক্তরাষ্ট্রকে বিমানটি উপহার দেয়। পরে প্রতিরক্ষা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এলথ্রি হ্যারিস টেকনোলজিস বিমানটি সংস্কার করে।
বোয়িংয়ের নতুন প্রজন্মের এয়ারফোর্স ওয়ান সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতা চলায় অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ব্যবহারের জন্য বিমানটি নেওয়া হয়েছিল। তবে দ্রুত সংস্কারের খরচ ও এর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল।
এর আগে ২০০০ সালেও একই ধরনের নিরাপত্তা কৌশল নেওয়া হয়েছিল। সে সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন পাকিস্তান সফরের সময় পরিচয়বিহীন একটি নির্বাহী উড়োজাহাজ ব্যবহার করেছিলেন। একই সময়ে তার আনুষ্ঠানিক এয়ারফোর্স ওয়ানকে ডিকয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।