
মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অনুকরণ করে অভিনয় করেছেন স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান পুলকিত মণি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও সমালোচনা।
অনুষ্ঠানে মণি মোদির অঙ্গভঙ্গি, কথা বলার ধরন এবং আচরণ নকল করে ব্যঙ্গাত্মক পরিবেশনা করেন। রাহুল গান্ধীও ওই পরিবেশনার একটি অংশে মণির সঙ্গে একই মঞ্চে ছিলেন।
মোদির কূটনীতি ও কথাবার্তার ধরন নিয়ে ব্যঙ্গ
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, শনিবার আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে রাহুল গান্ধী অল্প সময়ের একটি পরিবেশনায় কমেডিয়ান পুলকিত মণির সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করেন।
মণি সেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বহুল ব্যবহৃত ‘মাই ফ্রেন্ড’ সম্ভাষণকে অনুকরণ করেন। পাশাপাশি বিদেশি নেতাদের সঙ্গে মোদির কূটনৈতিক আলিঙ্গন, কথা বলার ধরন এবং শিশুদের সঙ্গে কথোপকথনের সময় তাঁর কয়েন নিয়ে করা কৌশল নিয়েও ব্যঙ্গ করেন।
রাহুল গান্ধীও ওই পরিবেশনায় অংশ নেন।
এর আগে চলতি বছরের মার্চে মোদির কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যঙ্গ করে পুলকিত মণির তৈরি একটি ইনস্টাগ্রাম রিল ব্যাপকভাবে দেখা হয়েছিল। পরে সেটি ভারতে ব্লক করে দেওয়া হয়।
ইন্দোরের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর রোববার মণি তাঁর ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে জানান, নয়ডায় তাঁর নির্ধারিত একটি অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে।
দর্শকদের উদ্দেশে মণি বলেন, ‘অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির’ কারণে অনুষ্ঠানটি বাতিল হয়েছে। একই সঙ্গে ইন্দোরে কংগ্রেসের অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি এবং নয়ডার অনুষ্ঠান বাতিল হওয়ার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে ইঙ্গিত দেন তিনি।
‘মাই ফ্রেন্ড’ থেকে ‘মা কো কুরসি দো’
ইন্দোরের অনুষ্ঠানে মোদির পররাষ্ট্রনীতি ছাড়াও তাঁর মাকে নিয়ে বক্তব্য ছিল।
পরিবেশনার এক পর্যায়ে মণি বলেন, ‘মাই ফ্রেন্ড, হাউ আর ইউ?’
এর জবাবে রাহুল গান্ধী বলেন, ‘আই অ্যাম ফাইন, হাউ আর ইউ, মোদি জি?’
এরপর মণি বলেন, ‘গ্রেট হ্যারাসমেন্ট’। একই সঙ্গে মোদির অঙ্গভঙ্গি অতিরঞ্জিত করে বারবার ‘মাই ফ্রেন্ড’ শব্দটি ব্যবহার করতে থাকেন তিনি।
এরপর রাহুল গান্ধী বলেন, ‘ভেরি নাইস টু মিট ইউ’ এবং মণিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘টেল মি মোর।’
জবাবে মণি বলেন, ‘মা কো কুরসি দো, মা!’ এরপর হাসতে হাসতে তিনি মোদির অঙ্গভঙ্গি অনুকরণ করেন। পরে বলেন, ‘সেটিং, মাই ফ্রেন্ড।’
ভারতে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়া গ্লোবাল এআই সামিটে গ্যালগোটিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রদর্শন করা একটি চীনা হিউম্যানয়েড রোবটকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের কথাও ওই পরিবেশনায় উঠে আসে।
এ ছাড়া শিশুদের সঙ্গে কথা বলার সময় মোদি যে কয়েনের কৌশল দেখিয়েছিলেন, সেটিও মঞ্চে অনুকরণ করেন মণি। তিনি নিজের কপালের ওপর একটি কয়েন রাখেন।
এই পরিবেশনায় দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যায়।
ভিডিও ছড়িয়ে দেয় কংগ্রেস
অনুষ্ঠানের কথোপকথনের কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ কংগ্রেস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশ করে। দলের অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া একটি ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘নরেন্দ্র মোদির ফরেন পলিসি।’
কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ পবন খেরাও ভিডিওটি নিজের অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেন। তিনি লেখেন, ‘ইন্দোরে হাসিখুশি বুদ্ধিমান ব্যক্তি হাজির হলেন, কপালে কয়েন রাখলেন এবং ‘গ্রেট হ্যারাসমেন্ট’-এর এক দুর্দান্ত প্রদর্শনী করলেন।’
‘মা কো কুরসি দো’ নিয়ে রাহুলকে আক্রমণ বিজেপির
এরপর রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সরব হয় বিজেপি। বিশেষ করে ‘মা কো কুরসি (চেয়ার) দো’ বক্তব্যটিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রয়াত মায়ের প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করে বিষয়টি সামনে আনে দলটি।
বিজেপির অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টে বলা হয়, ‘একদিকে প্রধানমন্ত্রী মোদি একজন প্রবীণ মাকে সম্মান ও ভালোবাসা দিয়েছেন, অন্যদিকে রাহুল গান্ধী তাঁর অনুষ্ঠানে তাঁকে নিয়ে উপহাস করেছেন। এটিই মূল্যবোধের রাজনীতি এবং লোকদেখানো রাজনীতির মধ্যে পার্থক্য।’
বিজেপি মুখপাত্রের কড়া সমালোচনা
বিজেপির মুখপাত্র সি আর কেশবনও রাহুল গান্ধীর সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, ‘কোনো ভদ্র ও সঠিক চিন্তাধারার মানুষ এই কুরুচিপূর্ণ, নিম্নমানের কর্মকাণ্ডকে মজার বলে মনে করতেন না। কিন্তু রাহুল গান্ধীকে তাঁদের সঙ্গে একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে হাসতে দেখা গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাহুল গান্ধীর সমর্থন পাওয়া এই অশালীন সংস্কৃতিই এর কারণ যে তিনি এবং কংগ্রেস তরুণদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছেন।’
‘একজন মা রাজনীতির বিষয় নন’: ধামী
উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামীও এক্সে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানান।
তিনি লেখেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদি জির প্রয়াত মাকে নিয়ে আপত্তিকর কথা বলা এবং রাহুল গান্ধীকে তাতে হাসতে দেখা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও বেদনাদায়ক।’
ধামী বলেন, ‘একজন মা রাজনীতির বিষয় নন। একজন মাকে অপমান কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী জির প্রয়াত মাকে নিয়ে করা অশালীন মন্তব্যে হাসা আপনাদের নিজেদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই প্রকাশ করে। রাহুল গান্ধীজি, রাজনৈতিক বিরোধিতায় শিষ্টাচারের সব সীমা অতিক্রম করা গণতন্ত্র নয়, সেবা নয়, সংস্কৃতিও নয়। দেশের মাতৃশক্তি সবকিছু দেখছে। এ ধরনের অসংবেদনশীলতা ও উপহাস কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
মোদির কূটনৈতিক পদ্ধতি নিয়ে রাহুলের প্রশ্ন
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের কূটনৈতিক পদ্ধতির সমালোচনা করে রাহুল গান্ধী বলেন, ‘আপনি শুধু কোনো বন্ধুর বাড়িতে যাচ্ছেন না। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই দায়িত্বে থেকে শুধু বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি করার কাজ করার কথা নয়। তাঁদের বন্ধুত্বে কোনো আগ্রহ নেই; তাঁদের কাজ হলো দেশকে রক্ষা করা।’