
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্য উত্তেজনা কমানো এবং ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনাই বৈঠকের অন্যতম প্রধান বিষয় হতে পারে।
বুধবার সন্ধ্যায় মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে শি জিনপিং ও তাঁর স্ত্রী পেং লিইউয়ানকে বিরল লালগালিচা সংবর্ধনায় স্বাগত জানান ট্রাম্প ও তাঁর স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প। গত ছয় দশকে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর আগে ওই ঘাঁটিতে সফরকারী কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানাননি।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারের বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’ হয়ে উঠবে।
তবে এক দশকেরও বেশি সময় পর শির প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফরে বাণিজ্য উত্তেজনার পাশাপাশি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ, ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্কের প্রভাব এবং চীনের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করা তাইওয়ান নিয়ে সম্ভাব্য সংঘাতসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।
জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে শিকে স্বাগত জানান ট্রাম্প। তবে মূল কর্মসূচি বৃহস্পতিবার সকালে। ওই সময় হোয়াইট হাউসে শিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানো হবে। এ সময় সামরিক উড়োজাহাজের প্রদর্শনী এবং প্রায় ৫০০ সামরিক সদস্যের অংশগ্রহণ থাকবে।
এরপর দুই নেতা দিনের বিভিন্ন সময়ে বৈঠক করবেন। পরে হোয়াইট হাউসে শির সম্মানে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করবেন ট্রাম্প। এতে দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে অ্যাপলের টিম কুক, এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং এবং ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান থাকতে পারেন।
শুক্রবার সকালে দুই দেশের প্রেসিডেন্ট ও তাঁদের স্ত্রীরা হোয়াইট হাউসে চা পান করবেন। এরপর জাতীয় আর্কাইভ পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে শির সফর শেষ হবে।
বৈঠকের পর দুই নেতা যৌথ সংবাদ সম্মেলন বা বিবৃতি না দিয়ে নিজ নিজ দেশের জনগণের কাছে তুলে ধরতে আলাদা ঘোষণা দিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবারের মূল বৈঠকের আগেই বাণিজ্য নিয়ে দুই দেশ একটি সম্ভাব্য সংকট এড়িয়েছে। দুই দেশের ১১ মাসের বর্তমান বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। সেটি এখন ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ফলে বৃহত্তর একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে দুই দেশের আলোচনাকারীরা আরও সময় পাচ্ছেন।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধও বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেতে পারে। ইরানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে শির সঙ্গে বৈঠক চলমান সংঘাতের অচলাবস্থা কাটাতে ট্রাম্পকে কতটা সহায়তা করতে পারবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, তেহরানের ওপর চীনের প্রভাব কাজে লাগাতে পারে ওয়াশিংটন। তবে ট্রাম্প এখন পর্যন্ত বলে আসছেন, এ বিষয়ে চীনের সহায়তা নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
দুই দেশের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির প্রতিযোগিতাও আলোচনায় আসতে পারে। উভয় দেশ এআই উন্নয়নে তীব্র প্রতিযোগিতায় থাকলেও প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়েও উদ্বিগ্ন। যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে একটি নতুন ‘নোটিফিকেশন মেকানিজম’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছে, যার মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে এমন গুরুতর এআই-সংক্রান্ত ঘটনার বিষয়ে একে অপরকে জানানো হবে।
তাইওয়ান ইস্যুও আলোচনায় তুলতে পারে চীন। গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের জন্য ১১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয়, যা ছিল দেশটির জন্য এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় অস্ত্রচুক্তি। তবে আরও প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ কয়েক মাস ধরে আটকে আছে। ট্রাম্প এসব অস্ত্র বিক্রিকে ‘খুব ভালো দর-কষাকষির হাতিয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
চীনে আটক কয়েকজন মার্কিন নাগরিকসহ অন্য বন্দীদের মুক্তির বিষয়টিও ট্রাম্প তুলতে পারেন। চলতি বছরের জুলাইয়ে চীনে আটক যাজক এজরা জিনকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকা ছিল। ২০২৫ সালে চীনের ভূগর্ভস্থ চার্চগুলোর ওপর চালানো অভিযানের অংশ হিসেবে তাঁকে আটক করা হয়েছিল। মে মাসে শির সঙ্গে বৈঠকে তাঁর বিষয়টি তুলেছিলেন ট্রাম্প।
শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর ট্রাম্পের ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে স্বাগত জানানো দুই নেতার সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।
এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে মেলানিয়া ট্রাম্প বলেন, তাঁর স্বামী শিকে স্বাগত জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কারণ দুই নেতার মধ্যে ‘চমৎকার সম্পর্ক’ রয়েছে।
তিনি বলেন, শি যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে এসেছেন এবং তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে সর্বোচ্চ সম্মানের সঙ্গে স্বাগত জানানো উচিত।
তবে সৌহার্দ্যপূর্ণ বক্তব্যের আড়ালে দুই নেতার সম্পর্কে টানাপোড়েনও রয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পরপরই দুই দেশের মধ্যে নতুন করে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়।
ফেন্টানিল ও অভিবাসনসংক্রান্ত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে চীনা পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে চীন মার্কিন কয়লা, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), অপরিশোধিত তেল ও গাড়ির ওপর শুল্ক আরোপ করে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি বিরল খনিজের রপ্তানিতেও বিধিনিষেধ দেয়।
পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শুল্ক তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছায় এবং বেইজিং তার নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের বিষয়ে সতর্ক করে। গত বছরের শেষ দিকে আরও সাতটি বিরল খনিজের রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপের হুমকিও দেয় চীন।
পরে ২০২৫ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও শির বৈঠকের পর দুই দেশ বাণিজ্যবিরতিতে পৌঁছালে এসব পদক্ষেপ স্থগিত রাখা হয়। চলতি বছরের মে মাসে ট্রাম্প চীন সফরে গেলে দুই দেশ ‘বোর্ড অব ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট’ গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। একই সময়ে শি বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ ও মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার বিষয়ে সম্মত হন।
তবে পরে জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগে চীনসহ ৬০টি বাণিজ্য অংশীদারের পণ্যে নতুন করে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প।
এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বৃহস্পতিবারের বৈঠকটি ট্রাম্প ও শির তৃতীয় সরাসরি বৈঠক। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কিছুটা কমলেও পারস্পরিক প্রতিযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
দুই দেশই একে অপরকে পরীক্ষা করে দেখছে, তবে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলছে। ট্রাম্পের রাষ্ট্রীয় সফরের সময় দুই দেশ ‘কৌশলগত স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে গঠনমূলক চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক’ বজায় রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। কূটনৈতিক মহলে এই কাঠামোকে ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ বলা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবারের বৈঠক এই অবস্থান কতটা টেকসই হবে, তা যাচাইয়ের আরেকটি সুযোগ তৈরি করবে।
বৈঠক থেকে নির্দিষ্ট কিছু খাতে শুল্ক কমানো, মাদক পাচার প্রতিরোধে সহযোগিতা এবং দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর মতো সমঝোতা আসতে পারে।
একই সঙ্গে এই বৈঠক চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি গতিপথ নির্ধারণ এবং পারস্পরিক সহযোগিতাকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।