
ভূমধ্যসাগরে অস্বাভাবিক মাত্রায় মাইক্রোঅ্যালগাল বা শৈবালের বিস্তারে বড় ধরনের পানি সরবরাহ সংকটে পড়েছে ইসরায়েল। শৈবালের কারণে দেশটির ছয়টি প্রধান সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রের মধ্যে পাঁচটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক দিন পর কেন্দ্রগুলো সীমিত পরিসরে চালু হলেও পানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই শৈবাল বিস্তারের প্রধান উৎস নীল নদের বদ্বীপ এলাকা থেকে আসা সামুদ্রিক প্রবাহ। তবে গাজার ক্ষতিগ্রস্ত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা থেকে অপরিশোধিত বর্জ্য ভূমধ্যসাগরে পড়ায় পানিতে নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের মতো পুষ্টি উপাদান বাড়ছে, যা শৈবালের বিস্তারকে আরও তীব্র করতে পারে।
ইসরায়েলি পরিবেশবাদী সংগঠন জালুল এনভায়রনমেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের ভাষ্য, দূষণ রাজনৈতিক সীমান্ত মানে না। গাজা থেকে সমুদ্রে অপরিশোধিত বর্জ্য প্রবাহিত হওয়ায় ইসরায়েলের পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনাগুলোর ওপর ঝুঁকি বাড়ছে। বর্জ্যে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান মাইক্রোঅ্যালগাল ও সায়ানোব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগরে ছড়িয়ে পড়া শৈবালের আস্তরণ প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। এর ফলে ইসরায়েলের ছয়টি বড় ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের মধ্যে পাঁচটির ফিল্টার ও পানি গ্রহণব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। পরে কয়েকটি কেন্দ্র আংশিক সক্ষমতায় কার্যক্রম শুরু করে।
বেন-গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও ডিস্যালিনেশন বিশেষজ্ঞ জ্যাক গিলরনের মতে, গাজা থেকে অপরিশোধিত বর্জ্য সমুদ্রে পড়া ইসরায়েলের দক্ষিণ ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে পানি উৎপাদন অবকাঠামোর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক ঘটনা ইসরায়েলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পানির উৎসকে সম্ভাব্য পরিবেশগত ঝুঁকি থেকে সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
এদিকে যুদ্ধের কারণে গাজার পানি ও পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামোর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গাজার পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা বর্তমানে গুরুতর সংকটে রয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টের শুরুতেও গাজার ৯১ শতাংশ মূল্যায়িত পরিবার মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার পানি-নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল।
গাজার পানি কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও পাম্পিং স্টেশনগুলোর কারণে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত বর্জ্য সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে। ১৭ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা জানায়, শেখ আজলিন বর্জ্য শোধনাগার পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কারণ প্রধান শোধনাগারগুলো বন্ধ থাকা এবং নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বেড়েছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ পানি ব্যবহারে জনগণকে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে পানি সরবরাহ কমানো এবং কৃষকদের সেচ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যপণ্যের দামের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন জালুল ও ইকোপিস মিডল ইস্ট গাজার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা দ্রুত পুনরুদ্ধার এবং বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, গাজা ও ইসরায়েলের পরিবেশগত সংকটকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই; সমুদ্র ও পানির দূষণের প্রভাব সীমান্তের দুই পাশেই পড়তে পারে।