
ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনায় সম্ভাব্য হামলার জন্য নতুন সামরিক পরিকল্পনা তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব পরিকল্পনায় দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী অ-পারমাণবিক বোমা ‘জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট’ (এমওএবি) ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশাল ধ্বংসক্ষমতার এই অস্ত্রটি ‘মাদার অব অল বম্বস’ বা ‘সব বোমার মা’ নামে পরিচিত।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে একাধিক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিলে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কিংবা পরে—উভয় সময়ের কথা মাথায় রেখেই সামরিক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
তবে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত এমওএবি ব্যবহার করা হয়নি। এই বোমা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে যুদ্ধের ভয়াবহতা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে অস্ত্রটি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত সামরিক লক্ষ্য অর্জন কিংবা যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানে নতুন করে হামলার বিভিন্ন বিকল্প তৈরি করছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এর মধ্যে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোর বড় অংশে আঘাত হানার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক হামলার সম্ভাবনা নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
অন্য একটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার পরিকল্পনাতেও এমওএবি ব্যবহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামের একটি স্থাপনা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ধারণা, ইরান সেখানে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির বিভিন্ন উপাদান মজুত রেখেছে। ট্রাম্পও একাধিকবার এই স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছেন।
তবে সেখানে এমওএবি ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিশাল ধ্বংসক্ষমতা, কিন্তু গভীর ভূগর্ভে আঘাতের সীমাবদ্ধতা
এমওএবি একটি জিপিএস-নির্দেশিত বিশাল আকারের বোমা। বিস্ফোরণের পর প্রায় নয়টি শহুরে ব্লকের সমপরিমাণ এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর ক্ষমতা রয়েছে অস্ত্রটির।
তবে শক্ত গ্রানাইট পাথরের একাধিক স্তরের গভীরে অবস্থিত স্থাপনা ধ্বংস করার ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, গভীর ভূগর্ভে প্রবেশ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য বোমাটি তৈরি করা হয়নি।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত এক মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোই এই অস্ত্রের মূল উদ্দেশ্য; ভূগর্ভের গভীরে প্রবেশ করে স্থাপনা ধ্বংস করা নয়।
এ কারণে ইরানের গভীর ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার ক্ষেত্রে বোমাটি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সামরিক পরিকল্পনাকারীদের সামনে প্রশ্ন রয়েছে।
এ ছাড়া জনবসতিপূর্ণ এলাকার কাছাকাছি এই অস্ত্র ব্যবহার করা হলে ব্যাপক প্রাণহানি এবং বেসামরিক অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
সামরিক আঘাতের পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক চাপের কৌশল
এমওএবি ব্যবহারের সম্ভাব্য পরিকল্পনার পেছনে শুধু সামরিক স্থাপনা ধ্বংসের উদ্দেশ্যই কাজ করছে না; ইরানের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক দাবির কাছে তেহরান নতি স্বীকার করতে অনিচ্ছুক—এমন পরিস্থিতিতে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু না করেও নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের উপায় হিসেবে এই বোমা ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অস্ত্রটি তৈরির সময় থেকেই শত্রুপক্ষের মধ্যে আতঙ্ক ও মানসিক চাপ সৃষ্টিতে এর সম্ভাব্য ভূমিকার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছিল।
আফগানিস্তানে প্রথম ব্যবহার, এবার লক্ষ্য ইরান?
২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সুড়ঙ্গ লক্ষ্য করে প্রথমবারের মতো যুদ্ধে এমওএবি ব্যবহার করে।
এবার ইরানের বিরুদ্ধে একই অস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা কার্যকর হলে চলমান সংঘাতে নতুন মাত্রা যুক্ত হতে পারে। তবে পরিকল্পনা তৈরি করা হলেও বোমাটি ব্যবহারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি।