
বিশ্বশান্তি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু করা জাতিসংঘের আজ ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে আন্তর্জাতিক এই সংস্থা। প্রতিবছর ২৪ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় জাতিসংঘ দিবস।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং লিগ অব নেশনসের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে সংঘাত প্রতিরোধ ও আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিসংঘ গঠিত হয়। বর্তমানে সংস্থাটির সদস্যরাষ্ট্র ১৯৩টি। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে এর সদর দপ্তর অবস্থিত। জাতিসংঘের নামকরণ করেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট।
জাতিসংঘের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হলেন মহাসচিব। বর্তমানে এ দায়িত্বে রয়েছেন পর্তুগালের নাগরিক আন্তোনিও গুতেরেস।
স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে সংস্থাটিতে যোগ দেয় দেশটি। এরপর থেকে বহুপক্ষীয় কূটনীতি, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়ন কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছে বাংলাদেশ।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শুরু হয় ১৯৮৮ সালে। সে বছর ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষক মিশনে কর্মকর্তা পাঠায় বাংলাদেশ। এরপর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার কাজে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশি সামরিক ও পুলিশ সদস্যরা। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সেনা ও পুলিশ সদস্য পাঠানো দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম প্রধান অবদানকারী।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ১৫ সদস্য নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে পাঁচটি স্থায়ী সদস্যরাষ্ট্র হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন। বাকি ১০টি সদস্যরাষ্ট্র অস্থায়ীভাবে নির্বাচিত হয়। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে।
জাতিসংঘের ছয়টি দাপ্তরিক ভাষা হলো ইংরেজি, ফরাসি, চীনা, রুশ, স্প্যানিশ ও আরবি। তবে জাতিসংঘ সচিবালয়ের কার্যকরী ভাষা ইংরেজি ও ফরাসি।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ২০২৬ সালের ২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি ৯৯ ভোট পেয়ে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে পরাজিত করেন। তাঁর এক বছরের মেয়াদ শুরু হয়েছে ৮ সেপ্টেম্বর থেকে।
এর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশের কূটনীতিক হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। ফলে আন্তর্জাতিক এই সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের পদে বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারের মতো প্রতিনিধিত্ব করছে।
জাতিসংঘ দিবস উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। দিবসটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, মানবাধিকার, শান্তি ও নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি জাতিসংঘ সনদের মূলনীতি বাস্তবায়নে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর অঙ্গীকার স্মরণ করিয়ে দেয়।
বিশ্বের নানা প্রান্তে চলমান সংঘাত, মানবিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন ও উন্নয়ন বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠার ৮১ বছরে সংস্থাটির সামনে যেমন রয়েছে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দায়িত্ব, তেমনি রয়েছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের প্রত্যাশা।