
ইসরায়েলের নির্বাচনে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিপুল অংশগ্রহণের ফলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট এবং বিরোধী দলগুলোর কোনোটিই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারছে না বলে প্রাথমিক ফলাফলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী জয়েন্ট লিস্ট ও রা'আম রেকর্ডসংখ্যক আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে ইসরায়েলের সংসদ নেসেটে আরব প্রতিনিধিত্ব নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বুধবার প্রকাশিত প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি নাগরিকদের উল্লেখযোগ্য ভোট নেতানিয়াহু কিংবা তাঁর বিরোধী জায়নবাদী দলগুলোর কোনো পক্ষকেই এককভাবে সরকার গঠনের মতো অবস্থানে পৌঁছাতে দেয়নি।
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির প্রকাশিত আংশিক ফলাফল অনুসারে, স্থানীয় সময় দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত—গ্রিনিচ মান সময় সকাল সাড়ে ১০টা—প্রায় ৭৭ শতাংশ ব্যালট গণনা শেষ হয়েছে। এতে নেতানিয়াহুর জোট ৫৪টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৪৯।
ইসরায়েলের সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠনের জন্য ৬১টি আসন প্রয়োজন। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই সংখ্যায় পৌঁছাতে উভয় পক্ষকেই আরও আসন পেতে হবে।
ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দুটি রাজনৈতিক জোট—জয়েন্ট লিস্ট ও রা'আম—সম্মিলিতভাবে ১৭টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই হিসাব চূড়ান্ত হলে নেসেটে আরব সংসদ সদস্যদের সংখ্যা হবে রেকর্ড পর্যায়ের।
তবে এসব ফলাফল এখনো চূড়ান্ত নয়। ভোট গণনা চলতে থাকায় আসনসংখ্যায় পরিবর্তন আসতে পারে।
ভোটার উপস্থিতিতে ১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ রেকর্ড
মঙ্গলবার ভোটগ্রহণ চলাকালেই বোঝা যাচ্ছিল, এবারের নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হবে। গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে চালানো হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে এটিই ছিল প্রথম নির্বাচন।
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে মোট ভোটার উপস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশে। ১৯৯৯ সালের পর কোনো নির্বাচনে এত বেশি ভোট পড়েনি।
গত চার বছরে ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা দেখেছেন, ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে গাজা ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে সহিংস ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের তৎপরতায় ফিলিস্তিনিদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে এবং ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সমাজে আরবদের প্রতি বৈষম্য আরও বেড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা বিপুল সংখ্যায় ভোট দিতে কেন্দ্রে যান। নির্বাচনের আগে তাঁদের অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, তাঁদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়েছে।
প্রাথমিক ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভোটের মাধ্যমে তাঁরা নেতানিয়াহু এবং তাঁর ইহুদি আধিপত্যবাদী মিত্রদের সরকার গঠনের পথে বাধা তৈরি করেছেন।
অন্যদিকে, সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরও ফিলিস্তিনি দলগুলোর সমর্থন ছাড়া কার্যকর সরকার গঠন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। নির্বাচনী প্রচারের সময় আইজেনকোটের অনেক সহযোগী ফিলিস্তিনি দলগুলোর সঙ্গে জোট করার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছিলেন।
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক। কিন্তু তাঁদের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রায় সব সময়ই দেশটির ক্ষমতাসীন জোটের বাইরে রাখা হয়েছে।
সরকার গঠনের আলোচনায় এগিয়ে থাকতে পারেন নেতানিয়াহু
নতুন সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা শুরু হওয়ার আগপর্যন্ত নেতানিয়াহুই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকছেন।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, তাঁর দল লিকুদ ২৭টি আসন পেয়ে নেসেটের বৃহত্তম দল হতে পারে। ইসরায়েলের প্রচলিত রাজনৈতিক রীতি অনুযায়ী, বৃহত্তম দলের নেতা হিসেবে নেতানিয়াহুই রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে প্রথমে সরকার গঠনের সুযোগ পেতে পারেন।
তবে সংসদে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠন করা এক বিষয় নয়। নেতানিয়াহুর জোট প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে না পারলে বৃহত্তম দল হওয়ার সুবিধা সত্ত্বেও তাঁর সামনে বড় বাধা থেকে যাবে।
বিরোধী জোটের নেতা ও সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকোট বলেছেন, নির্বাচনের ফলাফল নেতানিয়াহুর প্রতি মানুষের ‘আস্থার অভাব’ প্রকাশ করছে।
প্রাথমিক ফলাফলে আইজেনকোটের দল যশর ২২টি আসন পেয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের আরেক নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদ বলেছেন, নেতানিয়াহু ‘মারাত্মক পরাজয়’ বরণ করেছেন।
চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে সেনাসদস্যদের দেওয়া প্রায় পাঁচ লাখ ভোট গণনা করার কথা রয়েছে। এসব ভোট গণনার পর দলগুলোর আসনসংখ্যায় পরিবর্তন আসতে পারে।
নতুন নির্বাচন নাকি ক্ষমতা ভাগাভাগি?
প্রবীণ রাজনৈতিক ভাষ্যকার মেরন রাপোপোর্টের মতে, লিকুদ সংসদের বৃহত্তম দল হলেও নেতানিয়াহুর জোট যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন থেকে অনেক দূরে থাকে, তাহলে সেই অবস্থানের রাজনৈতিক গুরুত্ব সীমিত হয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, “আমরা কী ধরনের সরকার পাব তা স্পষ্ট নয়। যদি কোনো সরকার গঠন করা না যায়, তাহলে হয়তো নতুন নির্বাচন হবে,”
রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে বিরোধী দলগুলো কী ধরনের জোট গঠন করতে পারে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাপোপোর্ট উল্লেখ করেছেন, বিরোধী শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ নেতা নাফতালি বেনেট ও আভিগডর লিবারম্যান ফিলিস্তিনিদের প্রতি অত্যন্ত বিদ্বেষী অবস্থান পোষণ করেন এবং ফিলিস্তিনি দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।
তবে তিনি মনে করেন, আদর্শিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও নেতানিয়াহুকে ক্ষমতার বাইরে রাখার সুযোগ রাজনীতিবিদদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
রাপোপোর্টের বক্তব্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর পক্ষের ৫০টি আসনের বিপরীতে বিরোধী রাজনীতিকেরা যদি ৭০টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা গড়ে তোলার সুযোগ দেখেন, তাহলে তাঁদের সেই সুযোগ কাজে লাগানোর বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। তাঁর মতে, নেতানিয়াহুকে আবার সরকার গঠনের সুযোগ করে দিতে পারে—এমন আরেকটি নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়া বিরোধী রাজনীতিকদের জন্য প্রায় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে।
এদিকে, ইসরায়েলি গণমাধ্যমে রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের আরেকটি সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সেটি হলো নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির ভিত্তিতে একটি ‘জাতীয় ঐক্য সরকার’ গঠন। এমন ব্যবস্থা কার্যকর হলে দুই নেতার সমর্থকদের নিয়ে সরকার গঠনের পথ তৈরি হতে পারে।
ফিলিস্তিনি ভোটারদের অংশগ্রহণ ‘ঐতিহাসিক’
ইসরায়েলের ভানলিয়ার ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক আমির ফখুরি এবারের নির্বাচনে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ব্যাপক অংশগ্রহণকে একটি ‘সত্যিই ঐতিহাসিক ঘটনা’ বলে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, “তাদের জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত বিষয়গুলোর জন্য দায়ী রাজনৈতিক নেতৃত্বের মোকাবিলা করতে তারা অভূতপূর্ব সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে গিয়েছিলেন: গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ, পশ্চিম তীরে জাতিগত নির্মূল এবং দেশে বছরের পর বছর ধরে চলা নিপীড়ন ও ভীতি প্রদর্শন,”
ফখুরির মতে, এবারের নির্বাচনের গুরুত্ব কেবল ইসরায়েলের দীর্ঘতম সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে সরিয়ে দেওয়ার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর দৃষ্টিতে, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশটি বর্ণবৈষম্য বজায় রাখার পথ এবং রাজনৈতিক ও নৈতিক সংস্কারের সূচনা—এই দুই সম্ভাবনার মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।
তিনি বলেন, “এটি বর্ণবৈষম্যকে টিকিয়ে রাখা এবং রাজনৈতিক ও নৈতিক সংস্কার শুরু করার মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার পরিস্থিতি।”
ফখুরি আরও বলেন, “ইতিহাস ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের এক অসাধারণ অবস্থানে রেখেছে। সর্বাগ্রে নিজেদের জনগণকে রক্ষা করার জন্য একত্রিত হয়ে, তারা এখন ইহুদি ইসরায়েলিদেরও তাদের দেশের ধ্বংসাত্মক গতিপথ থেকে উদ্ধার করতে সাহায্য করতে পারে।”
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, “প্রশ্ন হলো, ইহুদি ইসরায়েলি রাজনৈতিক নেতারা সেই সম্ভাবনা মেনে নিতে প্রস্তুত কি না - নাকি একটি সামরিকীকৃত, জাতিশাসিত স্পার্টার দিকে ক্রমাগত পতনকেই বেছে নেবেন।”
সূত্র: দ্য মিডিল ইস্ট আই