
ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গঠনের দায়িত্ব কে পাবেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল ও বিভিন্ন এক্সিট পোলের পূর্বাভাসে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন শিবিরের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র উঠে এসেছে। তবে কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে সরকার গঠনের চূড়ান্ত সমীকরণে ছোট দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন প্রয়োজন। এবারের নির্বাচনে প্রধান দুই শিবিরের কেউই এই সীমায় পৌঁছাতে না পারায় সরকার গঠনের সম্ভাবনা নির্ভর করছে অন্য দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার ওপর।
আসনসংখ্যায় এগিয়ে নেতানিয়াহুর লিকুদ
ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির প্রাথমিক গণনা অনুযায়ী, ২৭টি আসন নিয়ে পার্লামেন্টের বৃহত্তম দল হিসেবে এগিয়ে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি। প্রাথমিক হিসাব বলছে, তাঁর নেতৃত্বাধীন জোট ৫৪টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে, আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৫০।
নির্বাচনের রাতে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের প্রকাশিত এক্সিট পোলেও দুই শিবিরের মধ্যে কাছাকাছি ব্যবধান দেখা গেছে। কান ১১ ও চ্যানেল ১৩-এর পূর্বাভাসে নেতানিয়াহু ও বিরোধী—উভয় জোটের জন্য ৫১টি করে আসন দেখানো হয়েছে।
চ্যানেল ১২-এর হিসাবে নেতানিয়াহুর জোট ৫২টি আসন পেতে পারে। সেখানে বিরোধী জোটের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৪৯। অন্যদিকে, চ্যানেল ১৫-এর পূর্বাভাসে নেতানিয়াহুর শিবিরের জন্য ৫৫টি এবং বিরোধীদের জন্য ৪৯টি আসনের হিসাব দেওয়া হয়েছে।
তবে এক্সিট পোলের হিসাবকে চূড়ান্ত ফল হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট গণনা শেষ হওয়ার পরই দুই জোটের প্রকৃত অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যাবে।
সরকার গঠনে আরব দলগুলোর ভূমিকা
ইসরায়েলের নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দল মোট ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পেলে নেসেটে আসন পাওয়ার যোগ্য হয়। তবে সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাই সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে সাধারণত একাধিক দলের সমর্থন প্রয়োজন হয়।
এবারের নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন রা’আম ও জয়েন্ট লিস্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিভিন্ন এক্সিট পোলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দল দুটির সম্মিলিত আসনসংখ্যা ১৬ থেকে ১৯টির মধ্যে থাকতে পারে।
তবে এই দলগুলোর সমর্থন পেলেই সরকার গঠনের পথ সহজ হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। নেতানিয়াহু আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের বিরোধিতা করেছেন। একইভাবে ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের নেতারাও আরব দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠনের বিষয়ে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
ফলে সংসদীয় আসনের হিসাবে আরব দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাজনৈতিক অবস্থান ও মতাদর্শগত বিরোধের কারণে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করা কঠিন হতে পারে।
নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের জোটে কারা
নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটে রয়েছে লিকুদ পার্টি, অতি-রক্ষণশীল দল শাস এবং ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম। এ ছাড়া বেজালেল স্মোট্রিচের নেতৃত্বাধীন রিলিজিয়াস জায়োনিজম এবং ইতামার বেন-গভিরের নেতৃত্বাধীন ওতজমা ইয়েহুদিতও এই শিবিরের অংশ।
অন্যদিকে, আইজেনকটের বিরোধী জোটে রয়েছে তাঁর নিজের দল ইয়াশার, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের জোট টুগেদার, অ্যাভিগডর লিবারম্যানের দল ইসরায়েল বেইতেনু এবং ইয়ার গোলানের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্র্যাটস।
এই দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা এবং সংসদে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করার সক্ষমতাই নির্ধারণ করবে, কোন শিবির শেষ পর্যন্ত সরকার গঠন করতে পারবে।
সরকার গঠনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া
চূড়ান্ত নির্বাচনী ফল প্রকাশের পর ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট এমন একজন আইনপ্রণেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন, যাঁর সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে মনে হবে।
দায়িত্ব পাওয়ার পর সরকার গঠনের জন্য ওই আইনপ্রণেতা ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজন হলে এই সময়সীমা আরও ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে।
প্রথম দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে অন্য কোনো আইনপ্রণেতাকে একই সুযোগ দেওয়া হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে নতুন নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ইসরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার কারণে একাধিকবার নির্বাচন আয়োজন করতে হয়েছিল। এবারের নির্বাচনের পরও রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে একই ধরনের পরিস্থিতি ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী থাকছেন নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিন দফায় সব মিলিয়ে ১৯ বছর ক্ষমতায় ছিলেন তিনি।
নতুন সরকার গঠনের আলোচনা চলার সময়ও তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর বিচার চলছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন নেতানিয়াহু।
আগামী ৪ নভেম্বর নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের কথা রয়েছে। তবে ফল ঘোষণার পরও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে দুই শিবিরের আলোচনা দীর্ঘায়িত হতে পারে। শেষ পর্যন্ত ছোট দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা এবং সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার সক্ষমতাই নির্ধারণ করবে ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার কারা গঠন করবে।