
উপসাগরীয় ছয় দেশ, ইরাক ও ইরানকে নিয়ে একটি অভিন্ন নিরাপত্তা চুক্তি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে ওমান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি বলেছেন, এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকেই নিজেদের সুরক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া ইরানবিরোধী অবস্থান আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছে।
বদর আল-বুসাইদি সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান—এই ছয় উপসাগরীয় দেশের পাশাপাশি ইরাক ও ইরানকে একটি অভিন্ন ‘অনধিকারপ্রবেশ’ নিরাপত্তা চুক্তির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন।
সোমবার যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এক কূটনৈতিক সফরকালে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর এখন নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার সময় এসেছে। একই সঙ্গে বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসারও প্রয়োজন রয়েছে।
বুসাইদির ভাষায়, “পারমাণবিক ও হরমুজ উভয় সমস্যারই সমাধান করা অসম্ভব, কারণ বহিরাগত শক্তিগুলোই সম্পর্কের শর্তাবলী নির্ধারণ করে চলেছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সম্মিলিত দায়িত্ব নিতে এবং সে বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে অক্ষম।”
তিনি আরও বলেন, “এ কারণেই আজকের বক্তব্যে আমি উপসাগরীয় অঞ্চলের আমাদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি যেন আমরা নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করি এবং তা অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে করি।”
ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতা
ইরানকে কেন্দ্র করে যখন ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, তখনই বুসাইদি এই বক্তব্য দিলেন। এর অংশ হিসেবে সোমবার তেহরানে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ইরানের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাইয়ের মতে, ওই আলোচনা প্রমাণ করেছে যে আঞ্চলিক কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির প্রভাব খুবই সীমিত। তিনি এই বৈঠককে একটি ‘প্রকৃত রূপান্তরের’ সূচনা হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।
মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের সদস্য সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান আলোচনায় অংশ নিয়েছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর লক্ষ্য হলো ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল নয়—এমন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা।
নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সংঘাতটি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও হুমকি হয়ে উঠেছে। এই উত্তেজনার মধ্যেই আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা এগিয়ে চলছে।
ইরানবিরোধী অবস্থান ক্ষতিকর
বুসাইদির মতে, ইরানকে নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা এই অঞ্চলের ওপর বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম ক্ষতিকর একটি সিদ্ধান্ত।
তিনি বলেন, “এর ফলে এই সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণার ওপর ভিত্তি করে একটি অস্থিতিশীল আঞ্চলিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে যে, ইরান এবং উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি মৌলিক আঞ্চলিক বৈরিতা রয়েছে।”
এরপর তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “এরকম কোনো মৌলিক বিরোধ নেই।”
বুসাইদি আরও উল্লেখ করেন, বিভিন্ন সমস্যা ও মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আরব ও পারস্য জনগোষ্ঠী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলে পাশাপাশি শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে এসেছে।
তাঁর মতে, ইরানকে বাদ দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হলে তা স্থায়ীভাবে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকবে।
তিনি বলেন, “উপসাগরীয় অঞ্চলের যে কোনো নিরাপত্তা কাঠামো, যেখানে [ইরান] অন্তর্ভুক্ত নয়, তা স্বভাবতই অস্থিতিশীল। এর কাঠামোই দুর্বল।”
বুসাইদির বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে যে ইরানবিরোধী মনোভাব ও কোনো দেশকে নিরাপত্তাব্যবস্থা থেকে দূরে রাখার নীতির পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় যুদ্ধের প্রভাব
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এসব দেশের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ইরান প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছে। কিন্তু এসব হামলা থেকে নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো হতাশা প্রকাশ করেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চাপ সৃষ্টি করেছে।
মার্চের শেষ নাগাদ এই যুদ্ধ সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত হানে। দুবাই ও আবুধাবির শেয়ারবাজারের সম্মিলিত বাজারমূল্য থেকে ১২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি কমে যায়। একই সময়ে ১৮ হাজার ৪০০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়।
এদিকে, হরমুজ প্রণালীতে চলমান অবরোধের অর্থনৈতিক প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ ঘিরে অচলাবস্থা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও চাপ তৈরি করেছে।
বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদ
বুসাইদির বক্তব্য, উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাইরের অংশীদারদের সহযোগিতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকার সুযোগ আর নেই। তাঁর মতে, এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে এমন একটি ‘অনধিকারপ্রবেশ চুক্তি’ গড়ে তোলাই এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত, যার মাধ্যমে একে অন্যের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান বজায় রাখা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, “এখন এমন সময় এসেছে যখন শুধু অন্য সবাইকে দোষারোপ করার আর কোনো মানে হয় না।”
নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আঞ্চলিক সংলাপ শুরু করার ওপরও জোর দিয়েছেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর মতে, বাইরের কোনো শক্তি এই অঞ্চলের জন্য নিজেদের পছন্দমতো সমাধান চাপিয়ে দেওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা শুরু হওয়া জরুরি।
বুসাইদি বলেন, “উপসাগরীয় নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের একটি নতুন আঞ্চলিক সংলাপ শুরু করতে হবে, এবং তা করতে হবে এই অঞ্চলের ওপর অন্য কোনো সমাধান চাপিয়ে দেওয়ার আগেই, যা কার্যকরভাবে নির্ভরশীলতা ও বর্জনের সেই ধারাকেই আরও দৃঢ় করবে, যার জন্য আমাদের জরুরিভাবে একটি বিকল্প খুঁজে বের করা প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বহিরাগত অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে। সামরিক সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত দায়বদ্ধতা ধীরে ধীরে কমে আসবে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগভিত্তিক অংশীদারত্বের গুরুত্ব বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।