
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের করা ১ হাজার কোটি ডলারের মানহানির মামলাটি স্থায়ীভাবে বাতিল করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রকৃত বিদ্বেষের প্রমাণ হাজির করতে না পারায় মিডিয়া ব্যবসায়ী রুপার্ট মারডক ও তাঁর মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে করা মামলাটি খারিজ করে দিয়েছেন আদালত।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) দেওয়া আদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ডিস্ট্রিক্ট জজ ড্যারিন গেইলস বলেন, মামলাটি টিকিয়ে রাখতে ট্রাম্পের আইনজীবীরা কার্যত খড়কুটো আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছেন। সংশোধিত অভিযোগপত্রেও সংবাদমাধ্যমটির বিরুদ্ধে প্রকৃত বিদ্বেষের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রায়ে বিচারক গেইলস বলেন, অভিযোগপত্রে প্রকৃত বিদ্বেষের বিষয়টি যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তা যথেষ্ট সুনির্দিষ্ট নয়। অভিযোগের অনেক বক্তব্যই অস্পষ্ট, সিদ্ধান্তনির্ভর এবং সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা তথ্যগুলো মিথ্যা জানতেন কি না, কিংবা সত্যতা যাচাই না করেই প্রকাশ করেছিলেন কি না, সেই প্রশ্নের সঙ্গেও অভিযোগের সরাসরি সম্পর্ক নেই।
বিচারক আরও মন্তব্য করেন, ট্রাম্পের আইনজীবীরা প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিভিন্ন অংশ থেকে ত্রুটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেসব বক্তব্য মানহানির অভিযোগ প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয়।
জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে ট্রাম্পের অতীত সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে এই আইনি বিরোধের সূত্রপাত। ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, ২০০৩ সালে এপস্টাইনের ৫০তম জন্মদিন উপলক্ষে তাঁকে একটি ইঙ্গিতপূর্ণ শুভেচ্ছাবার্তা দিয়েছিলেন ট্রাম্প।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপস্টাইনের জন্মদিন উপলক্ষে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে সংগ্রহ করা চিঠিগুলোর মধ্যে ট্রাম্পের নামে একটি বার্তাও ছিল। এসব চিঠি সংগ্রহ করেছিলেন এপস্টাইনের সহযোগী গিসলাইন ম্যাক্সওয়েল। যৌন পাচার কর্মকাণ্ডে এপস্টাইনকে সহায়তার দায়ে বর্তমানে ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন তিনি।
ট্রাম্পের নামে থাকা ওই বার্তায় টাইপ করা লেখার চারপাশে নারীদেহের অবয়বের নকশা ছিল এবং নিচে তাঁর স্বাক্ষর যুক্ত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে বার্তাটির লেখার বিষয়বস্তু, স্বাক্ষর ও নকশার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেন ট্রাম্প। প্রতিবেদনটিকে মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মানহানিকর আখ্যা দিয়ে ২০২৫ সালের ১৮ জুলাই মিয়ামির একটি ফেডারেল আদালতে মামলা করেন তিনি।
ওই প্রতিবেদনের কারণে তাঁর ব্যক্তিগত সুনাম ও আর্থিক অবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করেন ট্রাম্প। এ জন্য রুপার্ট মারডক ও সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের কাছে ১ হাজার কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়েছিলেন তিনি।
এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে বিচারক গেইলস প্রথমবারের মতো মামলাটি খারিজ করেছিলেন। তবে তখন ট্রাম্পকে অভিযোগ সংশোধন করে নতুন করে মামলা উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সেই সুযোগে মে মাসে সংশোধিত অভিযোগপত্র জমা দেন তাঁর আইনজীবীরা। কিন্তু নতুন অভিযোগেও প্রয়োজনীয় প্রমাণের ঘাটতি থাকায় শনিবার মামলাটি স্থায়ীভাবে বাতিল করেন আদালত। ফলে একই অভিযোগে নতুন করে মামলা করার সুযোগও বন্ধ হয়ে গেল।
উল্লেখ্য, অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন নিপীড়নের দায়ে ২০০৮ সালে এপস্টাইনের ১৩ মাসের কারাদণ্ড হয়েছিল। পরে ২০১৯ সালে মানব পাচারের অভিযোগে বিচারাধীন অবস্থায় নিউইয়র্কের একটি কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়। পরবর্তী সময়ে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে নিশ্চিত করা হয়।
এদিকে ২০০৫ সালে ট্রাম্পের মালিকানাধীন মার-আ-লাগো রিসোর্ট থেকে নারী কর্মীদের এপস্টাইন সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে তাঁদের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
বর্তমানে আরও দুটি সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগে ট্রাম্পের দায়ের করা মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রভাবশালী দৈনিকের বিরুদ্ধে করা মামলা।