
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের জেতাতে প্রায় ৪৫৮ মিলিয়ন ডলার বা ৪৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার ব্যয় করেছিলেন বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের একজন ইলন মাস্ক। কিন্তু বিপুল অর্থ ঢেলেও কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল পাননি তিনি। নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে রিপাবলিকান পার্টি। টেক্সাসেও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন মাস্কের সমর্থিত প্রার্থীরা। ফলে মার্কিন রাজনীতিতে প্রভাব এবং নিজের ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যবসায়িক আধিপত্য হুমকির মুখে পড়েছে।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া জানান মাস্ক। তিনি লেখেন, ‘মনে হচ্ছে, নির্বাচনে হস্তক্ষেপকারী আমার মহাকাশ লেজারগুলো এবার কাজ করেনি।’ আরেকটি পোস্টে বলেন, ‘মহাকাশে তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের ধারণাটি এখন বেশ আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে।’
নির্বাচনের ফলাফলে বড় ধাক্কা মাস্কের
৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পথে এগিয়ে যায়। রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির দাম এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির প্রতি অসন্তোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
নির্বাচনে মাস্কের সমর্থিত প্রার্থীদের মধ্যে বড় পরাজয় এসেছে টেক্সাসে। রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট জেমস তালারিকো। একই অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট জিনা হিনোজোসা। এর মধ্য দিয়ে তিন দশকের বেশি সময় পর টেক্সাসের গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে।
মাস্কের অর্থায়নের বড় অংশই গিয়েছিল রিপাবলিকানপন্থী রাজনৈতিক সংগঠন, নির্বাচনী তহবিল ও প্রার্থীদের কাছে। বিশেষ করে টেক্সাসে রিপাবলিকানদের জয় নিশ্চিত করতে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করেন। কিন্তু ফলাফল তাঁর প্রত্যাশার বিপরীত হয়েছে।
আর কী কী হারালেন মাস্ক?
নির্বাচনে অর্থ হারানোর পাশাপাশি ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন মাস্ক। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি চুক্তি, কর সুবিধা, ব্যবসা সম্প্রসারণের অনুমোদন এবং নতুন প্রযুক্তি অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা।
মাস্কের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা এবং মহাকাশ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের ব্যবসায় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিভিন্ন নীতি, অনুমোদন ও চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় এসব বিষয়ে মাস্কের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি বাড়তে পারে।
বিশেষ করে স্পেসএক্সের সরকারি চুক্তি ও ভর্তুকি, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা এবং সরকারি দক্ষতা বিভাগে (ডজ) মাস্কের ভূমিকা নিয়ে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা তদন্তের আগ্রহ দেখিয়েছেন। প্রতিনিধি পরিষদের নজরদারি কমিটির সম্ভাব্য চেয়ারম্যান রবার্ট গার্সিয়াও নির্বাচনের পর মাস্কের রাজনৈতিক সহযোগীদের উদ্দেশে ‘আইনজীবী ঠিক করুন’ বলে মন্তব্য করেছেন।
টেক্সাসে নতুন তথ্যকেন্দ্র নির্মাণও অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে। নবনির্বাচিত গভর্নর জিনা হিনোজোসা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় নতুন তথ্যকেন্দ্র প্রকল্পে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা এবং এ খাতের কর সুবিধা বন্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। অথচ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবসা সম্প্রসারণে মাস্কের জন্য এসব তথ্যকেন্দ্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া টেক্সাসের বোকা চিকায় স্পেসএক্সের কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও বাধার মুখে পড়তে পারে। সেখানে একটি সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন অঙ্গরাজ্যীয় পার্ক স্পেসএক্সের কাছে বিক্রির সম্ভাব্য উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন হিনোজোসা। টেসলা ও স্পেসএক্সের যৌথ চিপ নির্মাণ উদ্যোগের ক্ষেত্রেও টেক্সাসের রাজনৈতিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
শেয়ারবাজারের প্রভাবও সংকটাপন্ন
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ৪ নভেম্বর স্পেসএক্সের শেয়ারদর ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং টেসলার শেয়ারদর ৫ দশমিক ১ শতাংশ কমে যায়। ফলে রাজনৈতিক পরাজয়ের তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে মাস্কের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের বাজারমূল্যেও।
তবে শেয়ারদরের এই পতনকে স্থায়ী ক্ষতি বলা যাচ্ছে না। একইভাবে সরকারি চুক্তি বাতিল, কর সুবিধা প্রত্যাহার কিংবা প্রকল্প বন্ধ হওয়ার মতো সিদ্ধান্তও এখনো ঘটেনি। বরং ডেমোক্র্যাটদের নতুন রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে এসব ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি ও অনুমোদন পেতে বিলম্বের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাব হারানোর শঙ্কা
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিজয়ী করতে প্রায় ২৯০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিলেন মাস্ক। ট্রাম্পের বিজয়ের পর তাঁর প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন তিনি। সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও তাঁর প্রভাব তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের পর আবারও রিপাবলিকানদের পক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয় করে রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করেন মাস্ক। এবারের নির্বাচনে সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
সব মিলিয়ে মাস্কের ক্ষতি কেবল নির্বাচনে ব্যয় করা অর্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রিপাবলিকানদের পরাজয়ে কংগ্রেসে তাঁর রাজনৈতিক সমর্থন কমেছে, টেক্সাসে ব্যবসা সম্প্রসারণের অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ দুর্বল হয়েছে এবং সরকারি চুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো নির্মাণে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপুল প্রভাব থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনী রাজনীতিতে অর্থের সীমাবদ্ধতা এবার স্পষ্ট হয়েছে।