
ইসরায়েলের সাম্প্রতিক নির্বাচনের আগে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালিয়েছে ইরানি পরিচয়ে পরিচালিত ১ হাজার ৬৫৩টি ভুয়া অ্যাকাউন্ট। এসব অ্যাকাউন্ট থেকে হিব্রু ভাষায় পোস্ট দিয়ে ইসরায়েলিদের নেতানিয়াহুর দল লিকুদকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। তবে নির্বাচন শেষ হওয়ার পর অ্যাকাউন্টগুলো আবার ইরানের সাবেক শাহের ছেলে রেজা পাহলভির পক্ষে প্রচারণা শুরু করে।
শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যাকাউন্টগুলো নিজেদের ইরানে বসবাসকারী কিংবা বিদেশে থাকা ইরানি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিত। সেগুলো থেকে ইরানের জনগণের পক্ষ থেকে ইসরায়েলিদের উদ্দেশে নেতানিয়াহুকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। অ্যাকাউন্টগুলোর কার্যক্রমে সমন্বয়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও এগুলো কারা পরিচালনা করছে, তা এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
নির্বাচনের দিন এসব অ্যাকাউন্টের তৎপরতা আরও বেড়ে যায়। একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে একই ধরনের বার্তা প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন পোস্টে প্রায় একই সময়ে সমন্বিতভাবে মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
হারেৎজের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুটি অ্যাকাউন্ট থেকে একই ধরনের ১০৯টি পোস্ট প্রকাশ করা হয়েছিল। অথচ স্বাভাবিক বা স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবহারকারীদের কার্যক্রমে এমন পোস্টের সংখ্যা চারটির বেশি হওয়ার কথা নয়।
এ ছাড়া ৫৩টি ভিন্ন অ্যাকাউন্টের ২৩২টি পোস্টে ওই দুটি অ্যাকাউন্ট থেকে একই সময়ে অথবা পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে মন্তব্য করা হয়েছিল। এসব কার্যক্রম থেকে বোঝা যায়, অ্যাকাউন্টগুলো বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে একসঙ্গে কাজ করছিল।
নির্বাচনের দিন সকালে দুটি অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় এক ঘণ্টার ব্যবধানে একই হিব্রু বার্তা প্রকাশ করা হয়। সেখানে লেখা ছিল, ‘কাজটি শেষ করতে আমরা আপনাদের বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’ পোস্ট দুটির সঙ্গে #IsraeliElections2026 হ্যাশট্যাগও ব্যবহার করা হয়।
নির্বাচনের আগের দিন রাত ১০টার দিকে নেতানিয়াহুর একটি পোস্টের জবাবে একটি অ্যাকাউন্ট থেকে লেখা হয়, ‘আগামীকাল শুধু লিকুদ পার্টিকেই ভোট দিন।’
মধ্যরাতের পর দুই মিনিটের মধ্যে একই অ্যাকাউন্ট থেকে দুবার ‘বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ভোট দিন’ বার্তা প্রকাশ করা হয়।
এ ছাড়া রাত আনুমানিক ২টার দিকে হিব্রু ও ইংরেজি—দুই ভাষায় আরেকটি বার্তা দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, ‘ইসরায়েলের প্রিয় জনগণ, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এবং প্রতিরোধ অক্ষের হাত থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতে চাইলে ভোট দিন।’
হারেৎজ জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাব বিস্তার এবং পরিকল্পিতভাবে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান এক্সপোজের গবেষণার ভিত্তিতে এসব তথ্য সামনে এসেছে।
এর আগে হারেৎজের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরান সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু অ্যাকাউন্ট ইসরায়েলের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সেগুলো নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি তাঁর বিভিন্ন ভিডিও ছড়িয়ে দিচ্ছিল।
পরে ব্র্যান্ডেইস ইনস্টিটিউট ও ফেকরিপোর্টার এসব অ্যাকাউন্টের বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়ে ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনে আবেদন করে।
এক্সপোজের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব অ্যাকাউন্টের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬০০টি গত বছর থেকেই একটি পরিকল্পিত অনলাইন প্রচারণার অংশ হিসেবে শনাক্ত হয়েছিল। ওই প্রচারণার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষমতাসীন সরকারের বিকল্প হিসেবে দেশটির সর্বশেষ শাহের ছেলে রেজা পাহলভিকে সামনে নিয়ে আসা।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত হন ইরানের শেষ শাহ। তাঁর ছেলে রেজা পাহলভিকে ঘিরে পরিচালিত ওই প্রচারণায় এসব অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়েছিল।
ইসরায়েলে নির্বাচনী প্রচারণা গত জুলাইয়ে জোরালো হতে শুরু করলে ওই অ্যাকাউন্টগুলোর মধ্যে ১৮৫টি নেতানিয়াহুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যোগাযোগ ও কার্যক্রম শুরু করে। এ সময় নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের সমালোচনা করে প্রকাশিত পোস্টও সেগুলো থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
হারেৎজের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে ইসরায়েলের নির্বাচন শেষ হওয়ার পর অ্যাকাউন্টগুলো আবার তাদের আগের কার্যক্রমে ফিরে যায়। অর্থাৎ, রেজা পাহলভির পক্ষে প্রচারণাই হয়ে ওঠে সেগুলোর প্রধান তৎপরতা।
এদিকে এসব অনুসন্ধানের কিছু তথ্য অক্টোবরে বিশেষজ্ঞদের প্রমাণ হিসেবে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছিল। নেতানিয়াহু, তাঁর দল লিকুদ এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের বিরুদ্ধে ব্র্যান্ডেইস ইনস্টিটিউট ও ফেকরিপোর্টারের করা আবেদনের সঙ্গে এসব তথ্য যুক্ত করা হয়।
নির্বাচনের আগের দিন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি নোয়াম সলবার্গ আবেদনটি খারিজ করে দেন।
তবে তাঁর পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, অ্যাকাউন্টগুলোর কার্যক্রম নির্বাচনী প্রচারণার অর্থ ও উৎস প্রকাশসংক্রান্ত স্বচ্ছতার নিয়মের আওতাভুক্ত। প্রাথমিকভাবে এসব কার্যক্রমকে আইনের লঙ্ঘন বলেও মনে হয়েছে।
তবে অ্যাকাউন্টগুলো কারা পরিচালনা করছে, তা জানা না থাকায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান বিচারপতি। একই সঙ্গে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ পুলিশের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেন তিনি।
এর আগে অক্টোবরে প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও লিকুদ পার্টি ওই অ্যাকাউন্টগুলোর সঙ্গে নিজেদের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেছিল।