
বাংলা সাহিত্য, নাটক ও চলচ্চিত্রে এক অনন্য যুগের নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ নেই ১৪ বছর। তবু তার লেখা উপন্যাস, কালজয়ী নাটক, চলচ্চিত্র এবং অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্র আজও সমান আবেগে ফিরিয়ে আনে পাঠক-দর্শকদের। রবিবার, ১৯ জুলাই তার ১৪তম প্রয়াণ দিবসে নানা আয়োজনে স্মরণ করা হচ্ছে এই কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিককে।
২০১২ সালের ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হুমায়ূন আহমেদ। মৃত্যুর এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাংলা ভাষার জনপ্রিয় এই লেখকের সাহিত্য ও নাট্যভুবনের প্রভাব আজও অটুট।
নিজেরই লেখা গানে তিনি লিখেছিলেন, ‘যদি মন কাঁদে, তুমি চলে এসো এক বরষায়’। সেই পঙ্ক্তির মতোই বর্ষা এলেই ভক্ত-অনুরাগীদের মনে নতুন করে ফিরে আসেন তিনি। নুহাশ পল্লী, ধানমন্ডির ‘দখিন হাওয়া’ কিংবা তার সৃষ্টির ভুবনে যেন এখনও বিচরণ করেন প্রিয় লেখক।
১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত নেত্রকোনা মহকুমার মোহনগঞ্জে মাতামহের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন আহমেদ। তার বাবা শহীদ ফয়জুর রহমান আহমদ ছিলেন সাহিত্যপ্রেমী। বাবার চাকরির কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেড়ে ওঠায় শৈশব ও কৈশোরে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ হয় তার।
১৯৫৫ সালে সিলেটের কিশোরী মোহন পাঠশালায় তার শিক্ষাজীবনের সূচনা। পরে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ১৯৬৫ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। এরপর ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে প্রথম শ্রেণিতে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবনে তিনি হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের ৫৬৪ নম্বর কক্ষে থাকতেন।
প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশের পরই বাংলা সাহিত্যে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন হুমায়ূন আহমেদ। এরপর একের পর এক পাঠকপ্রিয় উপন্যাস লিখে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকদের একজন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘মাতাল হাওয়া’, ‘লীলাবতী’, ‘কবি’, ‘বাদশাহ নামদার’, ‘ময়ূরাক্ষী’, ‘দেয়াল’, ‘আমার আছে জল’, ‘সমুদ্র বিলাস’, ‘অয়োময়’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘নীল অপরাজিতা’, ‘জল জোছনা’, ‘নবনী’ এবং ‘যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ’সহ অসংখ্য সৃষ্টি।
ছোট পর্দাতেও তার সাফল্য ছিল ঈর্ষণীয়। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’ এবং ‘আজ রবিবার’ নাটকগুলো দর্শকপ্রিয়তার নতুন ইতিহাস গড়ে। পাশাপাশি নির্মাতা হিসেবেও তিনি উপহার দিয়েছেন ‘নক্ষত্রের রাত’, ‘উড়ে যায় বকপক্ষী’, ‘সেদিন চৈত্র মাস’, ‘নীতু তোমাকে ভালোবাসি’, ‘সমুদ্র বিলাস প্রাইভেট লিমিটেড’, ‘হাবলঙ্গের বাজারে’, ‘তারা তিন জন’ ও ‘মন্ত্রী মহোদয়ের আগমন শুভেচ্ছা স্বাগতম’-এর মতো জনপ্রিয় নাটক।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে হুমায়ূন আহমেদের অবদান এখনও প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে। প্রয়াণের ১৪ বছর পরও তার বইয়ের নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হচ্ছে, নাটক ও চলচ্চিত্র দেখছেন নতুন দর্শক, আর তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো রয়ে গেছে বাংলা ভাষার সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে চিরসবুজ।