
অসুস্থ বাবার ভরণপোষণ না দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর এবার পাল্টা বক্তব্য দিয়েছেন আলোচিত বক্তা জুবায়ের আহমাদ তাশরীফের মা। ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেছেন, তাশরীফ নিয়মিত বাবাকে আর্থিক সহায়তা দিতেন। পাশাপাশি তাশরীফের বাবা মাওলানা মো. হেদায়েতুল্লাহর বিরুদ্ধে ১৭ থেকে ১৮টি বিয়ে করার অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে তাশরীফের যাচাইকৃত ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এসব কথা বলেন তাঁর মা।
ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, তাশরীফ বাবার খোঁজখবর নেন না কিংবা তাঁর ভরণপোষণ করেন না—এমন অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। তাঁর ভাষায়, ‘তাশরীফের নামে যেসব অভিযোগ হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।’
তাশরীফের মা বলেন, ‘তাশরীফ তার বাবাকে প্রতি মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা দেয়। কিন্তু সম্প্রতি ঝগড়াঝাটির কারণে দু-তিন মাস ধরে সেটা দিচ্ছে না, তাই তার বাবা তার নামে এমন মিথ্যা অভিযোগ করেছেন। মূলত তিনি চান না তার ছেলে এত উপরে ওঠুক আর তিনি নিচে থাকেন।’
তাঁর অভিযোগ, অন্যদের কথায় প্রভাবিত হয়ে হেদায়েতুল্লাহ ছেলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘মানুষ তাকে (তাশরীফের বাবাকে) বলে, ‘তোর ছেলে এত উপরে থাকবে আর তুই এভাবে থাকবি কেন’— মানুষের এসব কথা শুনে তিনি তাশরীফের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেন।’’
তাশরীফের মায়ের দাবি, তিনি হেদায়েতুল্লাহর সংসারে থাকাকালেই তাঁর স্বামী সাতটি বিয়ে করেছিলেন। পরে আরও বিয়ের কথা শুনেছেন তিনি। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, ‘তাশরীফের বাবা তো অনেক বিয়ে করেছেন। আমি তার ঘরে থাকতেই তিনি সাতটি বিয়ে করেন। আমি আসার পর শুনেছি, তিনি ১৭ থেকে ১৮টি বিয়ে করেছেন।’
ছেলের বিরুদ্ধে বাবার অভিযোগকে ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে তাশরীফের মা আরও বলেন, ‘আমার ছেলে তার বাবার বাড়িতে গেলে একমুঠো ভাত পায় না। তাশরীফের সৎ মা আছে, তিনিও হয়তো বুদ্ধি-পরামর্শ দেন, এসব কথা শুনে মাওলানা হেদায়েতুল্লাহ এই ষড়যন্ত্র করেছেন। আবার যখন তাশরীফ তাকে টাকা দেবে, তখন সব ঠিক হয়ে যাবে। মূলত তিনি একজন টাকার লোভী। তিনি আমাকেও আমার বাবার বাড়ি থেকে সম্পদ আনার জন্য চাপ প্রয়োগ করতেন। আমাকে অত্যাচার করতেন।’
বাবার অভিযোগে যা উঠে এসেছিল
এর আগে এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে তাশরীফের বাবা মাওলানা মো. হেদায়েতুল্লাহ ছেলের বিরুদ্ধে ভরণপোষণ না দেওয়া, খোঁজখবর না রাখা এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েও আর্থিক সহায়তা না করার অভিযোগ করেন। তাঁর বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
হেদায়েতুল্লাহ বলেন, তাশরীফ এখন বিভিন্ন ঘটনায় মাইক্রোফোনে বক্তব্য দেন এবং ন্যায়-অন্যায় নিয়ে কথা বলেন। অথচ তাঁর অভিযোগ, অসুস্থ বাবার দেখাশোনা কিংবা ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করছেন না ছেলে।
নিজের বক্তব্যে হেদায়েতুল্লাহ ছেলেকে লেখাপড়া করানো ও হাফেজ-মাওলানা হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে তাঁর ত্যাগের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ছেলেকে পড়াশোনা করানোর বিষয়টি তাশরীফ অস্বীকার করেন। ছোটবেলায় তাশরীফের প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমস্যার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
হেদায়েতুল্লাহর ভাষ্য, ‘পড়াইয়া তারে আজকে মাওলানা বানাইছি, হাফেজ বানাইছি। সে অস্বীকার যায়, আমি বলে তারে পড়াইছি না। এরপরে তার আরেকটা কথা, সে ছোট সময় তার প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেছিল।পরে মানুষের কাছে ভিক্ষা কইরা কইরা, টাকা চাইয়া চাইয়া; আমি তো টাকা অল্প টাকা পাই, ইমামতি করি, তো টাকাটা চলে না। পরে মাইনষের কাছ থেকে চাইয়া চাইয়া, অনেক কষ্ট কইরা, তারে অনেক দিন পর্যন্ত ঢাকা, ময়মনসিংহ, মির্জাপুর হাসপাতালে আমি চিকিৎসা কইরা অনেক কষ্ট কইরা তারে আল্লাহ মুক্তি করছে, ভালো হইছে।’
নিজে অসুস্থ হওয়ার পর ছেলের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েও পাননি বলে অভিযোগ করেন হেদায়েতুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আমি যখন অসুস্থ ছিলাম, তারে কইছি, আমারে কিছু টাকা দে। পরে কিছু টাকা না দিয়া কয়, আমি জমি কিনমু। আমি টাকা দিতে পারতাম না, কষ্ট করে তোরে লেখাপড়া করলাম, লালনপালন করলাম, তুই টাকা দিতে পারতি না?’
পরে গণমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষের সহযোগিতা নিয়ে চিকিৎসা করানোর কথা জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, এক ব্যক্তি তাঁকে মানুষের কাছে সহায়তা চাইতে বলেন এবং আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। সেই সূত্রে পাওয়া অর্থ দিয়ে চিকিৎসা করালেও তিনি পুরোপুরি সুস্থ হননি। এখনো চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানান হেদায়েতুল্লাহ।
ছেলের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কথা বলতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘যখন তোমার কেউ ছিল না, তখন ছিলাম আমি। এখন তোমার সব হইছে, পর হইলাম আমি। সে আজকে আমার খোঁজখবর লয় না, আমারে সে দেহে না, আমারে টাকা-পয়সা দেয় না। আমি কষ্টের ভিতরে আছি।’
তাশরীফের আর্থিক অবস্থা ও বন্ধুদের প্রসঙ্গ টেনে হেদায়েতুল্লাহ বলেন, ‘তার অজস্র টাকা আছে, তার বন্ধুর অভাব নাই। আগে কি তার বন্ধু ছিল? আমি তারে কষ্ট করে পড়াইলাম, তারে কষ্ট করে পাললাম। সে আমারে তো কোনো দিন কিছু করে না।’
ইমামতির চাকরি ছাড়ার পরও টাকা পাননি, দাবি বাবার
হেদায়েতুল্লাহর অভিযোগ, তাশরীফের পরামর্শে তিনি স্থানীয় একটি বাজারের মসজিদে ইমামতির চাকরি ছেড়ে দেন। ছেলের কাছ থেকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা পাওয়ার আশ্বাসে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানান।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এরপরে কিছুদিন আগে আমি এই বাজার মসজিদে ইমামতি করি। এহন আইছে, আমি চেয়ারম্যান দাঁড়ামু, তুমি দোয়া করে আমারে মাফ করে দিও। আমি কইলাম, ঠিক আছে, ছেলে হিসেবে মাফ চাইছোস, মাফ করে দিলাম। মাফ করে দেওয়ার পরে কয়, ঠিক আছে, তাইলে তুমি চাকরি ছাইড়া দাও, তোমারে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা দিমু। আমি কইলাম, ঠিক আছে, চাকরি ছেড়ে দিলাম। তার কথা অনুযায়ী চাকরি ছাইড়ে দিছি। পরে আমারে এক টাকাও দেয় না।’
ছেলের ব্যক্তিগত সহকারী ওবায়দুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো সমাধান পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘তার লগে পিএস আছে, ওবায়দুল্লাহ। তারে কই, কিরে, হে তো টাকা দেয় না? ফোন দিলে ফোন ধরে না। ১০০ ফোন দেই, ফোন যত দেই, ফোন রিসিভ করে না।’
ছেলে ও তাঁর সহকারীর কাছে বারবার ফোন করেও সাড়া না পাওয়ার কথা জানিয়ে হেদায়েতুল্লাহ বলেন, ‘আমি বাবা, সে সন্তান, তারে আমি ফোন দেই, রিসিভ করে না। পরে ওবায়দুল্লাহরে দিছি। ওবায়দুল্লাহ কয়, মাসে কিছু সমস্যা, পরে দিব। পরে ফোন দিতে দিতে বিরক্তি। ফোন ধরে না। টাকা-পয়সা লাগব না, আল্লাহ চালাইবো।’
কোরবানির মাংস না পাওয়ার অভিযোগ
কোরবানির ঈদে তাশরীফের সঙ্গে কথোপকথনের একটি ঘটনাও তুলে ধরেন তাঁর বাবা। হেদায়েতুল্লাহর দাবি, ছেলে তাঁকে জানিয়েছিলেন, ঈদে একটি গরু কোরবানি দেবেন। তখন তিনি স্থানীয়ভাবে কোরবানি দিয়ে মাংস ভাগ করে নেওয়ার কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘পরে হে কুরবানি আইছে, কইছে, আমি একটা গরু কুরবানি দিমু। তাইলে কি করাম? তাইলে এলাকায় কুরবানি দে, এলাকার মাইনষে কিছু গোশত দে, আমিও কিছু নিমু।’
তবে তাশরীফ তাঁর বন্ধুদের মধ্যে যাঁরা কোরবানি দিতে পারেন না, তাঁদের মাংস দেওয়ার কথা বলেছিলেন বলে জানান হেদায়েতুল্লাহ। তাঁর বক্তব্য, ‘পরে কয়, আমার তো বিভিন্ন বন্ধুবান্ধব আছে। এরা অনেকেই কুরবানি দিতে পারে না। তাগরে টাকা-পয়সা দেওয়া লাগব, গোশত দেওয়া লাগব। আমি কইলাম, সমস্যা নাই, তোর বন্ধুবান্ধব কুরবানি দিতে পারে না, তাগরে গোশত দে। আমারে এক টুকরা গোশত দিল না।’
বাবা ও মায়ের বক্তব্যে পরস্পরবিরোধী অভিযোগ উঠে এসেছে। তাশরীফের মায়ের দাবি, আর্থিক সহায়তা নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। অন্যদিকে হেদায়েতুল্লাহর অভিযোগ, ছেলে তাঁর ভরণপোষণ ও খোঁজখবর রাখছেন না। এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।