
জ্বালানি তেল নিয়ে অযথা আতঙ্কই বাজারে কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি করছে—এমন মন্তব্য করে সীমান্তে পাচার রোধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
সোমবার (৩০ মার্চ) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, “জ্বালানি তেলের বিষয়ে সবাই মিলে সাশ্রয়ী ও সচেতন হলে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ হবে। অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা পরিহার ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযত হওয়া এখন সময়ের দাবি। আসুন, আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। ব্যক্তি নয়, দেশ; অপচয় নয়, সাশ্রয়; বিভক্তি নয়, ঐক্য—সবার আগে বাংলাদেশ।”
তিনি আরও বলেন, অযথা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনা ও মজুত করাই বাজারে অস্বাভাবিক চাপ তৈরির প্রধান কারণ। জ্বালানি খাত দেশের অর্থনীতি, স্থিতিশীলতা, দৈনন্দিন জীবন ও উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক সংঘাত ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে সরবরাহ চাপের মুখে রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে সরকার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে এবং দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। গত বছরের তুলনায় সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বর্তমান মজুতের তথ্য তুলে ধরে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দিন (১৭ ফেব্রুয়ারি) দেশে ডিজেলের মজুত ছিল ২ লাখ ৬ হাজার মেট্রিক টন, যা বর্তমানে বেড়ে ২ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। গত ৪১ দিনে ৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বিক্রি হলেও মজুত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সরকারের আগাম প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক আমদানির প্রমাণ।
তিনি জানান, পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাত সচল রাখতে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলের মজুত আরও বাড়ানো হচ্ছে। গত বছরের মার্চের চাহিদা বিবেচনায় এবার ১০ থেকে ২৫ শতাংশ বেশি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হলেও বাস্তবে চাহিদা সে অনুপাতে বাড়েনি। বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি কেনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, গত বছরের মার্চে দৈনিক ডিজেলের চাহিদা ছিল ১২ হাজার মেট্রিক টন, অকটেন ১ হাজার ২০০ এবং পেট্রল ১ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। চলতি বছরের ১ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত অকটেন বিক্রি হয়েছে ২৮ হাজার ৯৩৯ মেট্রিক টন, যা দৈনিক গড়ে ১ হাজার ২৫৮ মেট্রিক টন।
তেজগাঁওয়ের একটি পেট্রল পাম্পের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে গত বছরের তুলনায় অকটেন বিক্রি প্রায় ৯৬ শতাংশ বেড়েছে।
মোট ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৫ শতাংশই ডিজেল উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এর সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে অকটেন (৬.৮ শতাংশ) ও পেট্রল (৬.৭৭ শতাংশ) নিয়ে ফিলিং স্টেশনে যে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে, তা প্রকৃত সংকটের প্রতিফলন নয়; বরং অতিরিক্ত মজুতের প্রবণতার ফল।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান পরিচালনা করেছে। এতে ১৫৩টি মামলা, ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং ১৬ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিপুল পরিমাণ জ্বালানি উদ্ধার করা হয়েছে।
এপ্রিল মাসে ৫০ হাজার মেট্রিক টন অকটেন আমদানি এবং দেশীয় উৎস থেকে আরও ৩০ হাজার মেট্রিক টন সরবরাহের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সরকারের মজুত দিয়ে অন্তত দুই মাসের চাহিদা সহজেই পূরণ করা সম্ভব।
জ্বালানি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ তুলে ধরে তিনি জানান, মার্চ-জুন প্রান্তিকে ডিজেল ও অকটেনে ১৬ হাজার ৪৫ কোটি টাকা এবং এলএনজি আমদানিতে ১৫ হাজার ৭৭ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হবে।
বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও পরিবহন, শিক্ষা ও শিল্প খাত সচল রাখতে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।