
অতীতের গভীর বন্ধন থেকেই ভবিষ্যতের পথ দেখছে ঢাকা ও নয়াদিল্লি—দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নতুন করে শুরু হচ্ছে না, বরং ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এগোচ্ছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। এনডিটিভিকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ সম্পর্কের অগ্রগতি হবে ‘ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে’।
এই সম্পর্কের প্রতীকী প্রতিফলন হিসেবে তিনি ২৬ মার্চ দিল্লিতে বাংলাদেশের জাতীয় দিবস উদযাপনের কথা উল্লেখ করেন। সেখানে দুই দেশের জাতীয় সংগীত সরাসরি পরিবেশনা ছিল তার মতে এক ‘স্মরণীয় মুহূর্ত’, যা পারস্পরিক বন্ধনের দৃঢ়তাকে তুলে ধরে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘নয়াদিল্লির পরিবেশে তিনি এক ধরনের ‘সম্মিলন’ লক্ষ্য করেছেন। সেখানে দুই দেশই ‘আলোচনা, সম্পৃক্ততা ও উদ্যোগ নিতে আগ্রহী’।
তিনি আরও জানান, সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে উভয় দেশ কাজ করছে, তবে দ্রুত ফলের চেয়ে আস্থা গড়ে তোলাই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ধৈর্যের ওপর জোর দেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটজনিত বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতা মোকাবিলায় ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগকে তিনি ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখছেন। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও জ্বালানি সরবরাহে চাপ অনুভব করছে।
খলিলুর রহমান বলেন, ‘সংকটের সময় ঢাকা যখন অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তখন ভারত দ্রুত সাড়া দেয়।’
তিনি যোগ করেন, ‘আমাদের একটি পাইপলাইন আছে এবং ভারত বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহ করছে।’
সম্প্রতি দিল্লি সফরে গিয়ে তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে মরিশাসে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়ে এনডিটিভিকে সাক্ষাৎকার দেন।
তিনি জানান, মরিশাস সফরের আগে ভারতের কাছে ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর অনুরোধ করা হয়েছিল। কিছু লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নয়াদিল্লি আশ্বাস দিয়েছে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পর সরবরাহ বাড়ানো হবে।
গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালের এই চুক্তি এ বছর পুনর্বিবেচনার জন্য নির্ধারিত রয়েছে। তার মতে, ‘ন্যায্য ও জলবায়ু সহনশীল পানি বণ্টন ব্যবস্থা একটি ‘সভ্যতাগত বন্ধন’।
তিনি বলেন, ‘পানি সীমিত। গঙ্গা মানেই জীবন। সীমান্তের দুই পাশেই জীবিকা নির্ভর করে অভিন্ন নদীগুলোর পানিপ্রবাহের ওপর।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, নয়াদিল্লিতে তিনি যে ‘আগ্রহ ও সদিচ্ছা’ দেখেছেন, তা ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করবে। তিনি আরও বলেন, ‘যৌথ সম্পদের মাধ্যমে জলবায়ু সহনশীলতা অর্জন আগামী অন্তত তিন দশকের জন্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে।’
খলিলুর রহমান বলেন, ‘মানুষ তো মানুষই-ভারত হোক বা বাংলাদেশ। আমরা একই ধরনের জলবায়ু সংকটের মুখোমুখি।’ একই সঙ্গে মানুষে-মানুষে যোগাযোগ ও সহজ ভিসা ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
চীন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জের পরও বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিকে প্রতিযোগিতামূলক শূন্য-সম খেলা হিসেবে দেখে না। ‘অন্য দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কোনো সমস্যা নয়’—উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাণিজ্য ঘাটতি মূলত বাজারগত কারণে তৈরি হয়, কৌশলগত অবস্থানের কারণে নয়।
শেষে তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক পরিপূরকতা, সীমান্ত পারাপার সংযোগ এবং যৌথ অবকাঠামো-এসবের সুফল দুই দেশের মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।’ তার মতে, ভারতের ভূমিকা বাংলাদেশের জন্য বাহ্যিক নয়, বরং একটি ‘কাঠামোগত উপস্থিতি’।