
হজ ফেরত যাত্রীদের মালামাল চুরি ও লাগেজ কেটে ফেলার যে খবরটি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে, তা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। রাষ্ট্রীয় এই বিমান সংস্থাটির দাবি, ঢাকা বিমানবন্দরে হজ ফ্লাইটের মালামাল খালাস ও হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের চুরি কিংবা গাফিলতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এয়ারপোর্ট সার্ভিসেসের মহাব্যবস্থাপক শাহনুর আহম্মদ স্বাক্ষরিত একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানবন্দরের সিসিটিভি ক্যামেরার রেকর্ড, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মীদের বডি-ওর্ন (শরীরে জড়ানো) ক্যামেরার ফুটেজ এবং অফিশিয়াল লগ বুক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেই এই সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
অনুসন্ধানলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, গত ২ জুন সৌদি আরবের জেদ্দা থেকে ৪১৯ জন হজযাত্রী নিয়ে বিমানের বিশেষ ফ্লাইট ‘বিজি ৩১০৪’ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। মূলত এই নির্দিষ্ট ফ্লাইটের যাত্রীদের লাগেজ কেটেই মালামাল চুরির একটি কাল্পনিক দাবি নেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
তবে বিমান কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যবিবরণী বলছে, শতভাগ আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই উড়োজাহাজ থেকে যাত্রীদের মালামাল খালাস করা হয়েছে। ২ জুন দিবাগত রাত ২টা ৫২ মিনিটে ফ্লাইটটি রানওয়েতে চকের অবস্থানে পৌঁছানোর মাত্র কয়েক মিনিটের মাথায় ব্যাগ নামানোর কাজ শুরু হয়। এরপর রাত ৩টা ৫ মিনিটে প্রথম ব্যাগটি বেল্টে দেওয়া হয় এবং রাত ৩টা ৫১ মিনিটের মধ্যে সর্বমোট ৮৩৬টি লাগেজ সফলভাবে ডেলিভারি বেল্টে স্থানান্তর সম্পন্ন করা হয়।
প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানোর এই পুরো সংবেদনশীল প্রক্রিয়াটি বিমানবন্দর সিকিউরিটি অথরিটির প্রত্যক্ষ উপস্থিতি ও কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তাছাড়া, সিসিটিভি ও বডি-ওর্ন ক্যামেরার ভিডিও রেকর্ড ঘেঁটে দেখা গেছে, সৌদি আরবের জেদ্দা বিমানবন্দর থেকেই অন্তত ২১টি লাগেজ ভাঙা বা ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় বিমানের হ্যান্ডলিং কর্মীরা গ্রহণ করেছিলেন।
এদিকে বিমানবন্দরে অবস্থিত লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড ডেস্কের দাপ্তরিক নথিপত্র ঘেঁটেও মালামাল খোয়া যাওয়া বা চুরির বড় কোনো অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। কেবল অল্প কয়েকজন যাত্রী তাদের লাগেজ সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা মৌখিকভাবে দায়িত্বরতদের জানিয়েছিলেন। তবে ওই সব ব্যাগে মূলত জমজমের পানি, শ্যাম্পু, লোশন ও খেজুরের মতো সামগ্রী ছিল বলে তদন্তে জানা গেছে।
এর বাইরে একজন সাধারণ যাত্রী তাঁর লাগেজ থেকে মানিব্যাগ চুরির একটি মৌখিক দাবি তুললেও, পরবর্তীতে তিনি বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক বা লিখিত অভিযোগ দায়ের করেননি।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কারিগরি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বৈশ্বিক বিমান চলাচলের নিয়ম অনুসারে বুকিং দেওয়া মূল লাগেজের ভেতর তরল পদার্থ, জমজমের পানি কিংবা নির্দিষ্ট কিছু প্রসাধনী সামগ্রী পরিবহন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জেদ্দা বিমানবন্দরে স্ক্যানিং করার সময় যাত্রীদের ব্যাগে এসব নিষিদ্ধ জিনিস ধরা পড়লে সেখানকার নিরাপত্তা কর্মীরা বিধি মোতাবেক লাগেজ খুলে তা তল্লাশি বা অপসারণ করেন। মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দরে ঘটা এই বৈধ আইনি প্রক্রিয়াকেই অনেকে না বুঝে বা ভুলবশত বাংলাদেশে এসে 'লাগেজ কাটা হয়েছে' বলে অপপ্রচার চালাচ্ছেন বলে দাবি করেছে বিমান কর্তৃপক্ষ।