
দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্কে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করে পটুয়াখালীর অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। ১ দশমিক ৩৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল সেতুসহ সংযোগ সড়ক নির্মাণের লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) দুই দেশের মধ্যে এই বাস্তবায়ন চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়। এই প্রকল্পের আওতায় মোট ২ দশমিক ৬২ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘৯ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু’ এবং এর এপ্রোচ সড়ক নির্মাণ করা হবে।
রাজধানী ঢাকার সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সম্মেলন কক্ষে এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা চূড়ান্ত হয়। চুক্তিপত্রে বাংলাদেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বৈদেশিক সহায়তা অধিশাখার যুগ্মসচিব ড. মো. মোকছেদ আলী এবং চীন সরকারের পক্ষে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের কাউন্সেলর সং ইয়াং।
পটুয়াখালীর তিন উপজেলার ভাগ্যবদল ও সেতুর অবস্থান
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, এই ৯ম বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সেতুটি পটুয়াখালী জেলার লেবুখালী–বাউফল–গলাচিপা–আমড়াগাছিয়া জেলা মহাসড়কের ১৪তম কিলোমিটারে নির্মাণ করা হবে। এটি মূলত লোহালিয়া নদীর ওপর অবস্থিত বগা ফেরিঘাটের ঠিক ভাটির অংশে তৈরি হতে যাচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে পটুয়াখালীর বাউফল, গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলার লাখ লাখ সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা উৎপাদিত কৃষিপণ্য, মাছ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠাতে এই বগা ফেরিঘাটের ওপর চরম ভোগান্তি নিয়ে নির্ভরশীল ছিলেন। লোহালিয়া নদীর ওপর এই আধুনিক সেতুটি নির্মিত হলে এ অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহন আগের চেয়ে অনেক সহজ, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ হবে।
প্রকল্পের খুঁটিনাটি ও দুই দেশের অর্থায়ন ভাগাভাগি
প্রস্তাবিত এই মেগা প্রকল্পের মোট দৈর্ঘ্য প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ২ দশমিক ৬২ কিলোমিটার। যার মূল অবকাঠামোগত বিন্যাস নিচে দেওয়া হলো:
মূল সেতুর দৈর্ঘ্য: প্রায় ১ দশমিক ৩৪৮ কিলোমিটার।
সংযোগ সড়কের দৈর্ঘ্য: প্রায় ১ দশমিক ২৭২ কিলোমিটার।
চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্ত অনুযায়ী, মূল সেতু এবং সংযোগ সড়ক নির্মাণের যাবতীয় নির্মাণ ব্যয় অনুদান হিসেবে সরাসরি বহন করবে চীন সরকার। অপরদিকে, প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ (জায়গা কেনা), বিভিন্ন ইউটিলিটি সার্ভিস লাইন স্থানান্তর এবং অন্যান্য প্রশাসনিক আনুষঙ্গিক সব খরচ দেবে বাংলাদেশ সরকার। এই চুক্তি স্বাক্ষরের পর চীন সরকারের মনোনীত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান খুব দ্রুত সেতুর বিস্তারিত নকশা (ডিটেইলড ডিজাইন) প্রণয়ন ও তা চূড়ান্ত করার কাজ শুরু করবে।
একই সময়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও এই প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির আনুষ্ঠানিকতা বেশ জোরেশোরে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দুই দেশের অভ্যন্তরীণ এই সমস্ত দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরপরই মাঠপর্যায়ে সেতুর মূল নির্মাণকাজ শুরু হবে।
এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন স্বশরীরে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (আরএইচডি) এবং চীন সরকারের উচ্চপদস্থ ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা এই সময় উপস্থিত ছিলেন।