
জাতীয় সংসদের পবিত্র অধিবেশনে বোরকা, হিজাব ও নিকাব পরিহিত নারীদের লক্ষ্য করে সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর দেওয়া একটি বিতর্কিত বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে দেশের সাধারণ আলেম সমাজ। পর্দানির্ভর নারীদের সামাজিক মর্যাদা ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে অভিযুক্ত ওই সংসদ সদস্যকে অবিলম্বে জনসমক্ষে ও প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার জোরালো দাবি তুলেছে ওলামা সমাজ।
আজ রোববার (১৪ জুন) দেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে পাঠানো এক যৌথ ও আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ লিপিতে ওলামা সংগঠনের শীর্ষ নেতারা এই ক্ষুব্ধ দাবি উত্থাপন করেন।
বিবৃতিতে আলেম সমাজ অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে উল্লেখ করেন যে, জাতীয় সংসদ হচ্ছে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী ও নীতি নির্ধারণী পবিত্র প্রতিষ্ঠান। আইনসভার ভেতরে দাঁড়িয়ে করা যেকোনো মন্তব্য বা উচ্চারিত বক্তব্য দেশের সার্বিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গির সরাসরি প্রতিফলন ঘটায়। আর সে কারণেই দেশের একটি বিশাল অংশের মুসলিম নারীদের হিজাব ও নিকাব পরিধানের মতো ধর্মীয় বিধান নিয়ে সংসদ ভবনে কৌতুক, বিদ্রুপ বা অমূলক সন্দেহ প্রকাশ করা অত্যন্ত অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্ক্ষিত ও চরম আপত্তিকর।
আলেমদের অভিযোগ, ওই সংসদ সদস্য তাঁর বক্তব্যে হিজাবধারী নারীদের আসল পরিচয় ও তাঁদের চলাফেরার উপস্থিতিকে এক ধরনের সন্দেহের চোখে দেখানোর অপচেষ্টা করেছেন। অথচ বাস্তব চিত্র হলো, জাতীয় সংসদের ভেতরে প্রবেশ করতে হলে দেশের যেকোনো নাগরিককে একাধিক স্তরের কঠোর নিরাপত্তা বলয় পার হতে হয়, যেখানে সুনির্দিষ্ট পরিচয় যাচাই ও কঠোর প্রটোকল সর্বদাই কার্যকর থাকে। এমন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মাঝেও বোরকার আড়ালে অন্য কেউ ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকতে পারে—এমপি মনিরুল হকের এ ধরনের ইঙ্গিত সম্পূর্ণ বাস্তবতাবিবর্জিত। এই রূপ বক্তব্য পর্দানশীন মুসলিম নারীদের প্রতি সমাজে অযৌক্তিক সন্দেহ তৈরি করার পাশাপাশি তাঁদের চরম সামাজিক অপমানের মুখোমুখি করবে।
বিবৃতিতে আলেম সমাজ ধর্মীয় পোশাকের অধিকারের বিষয়টিকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, হিজাব কিংবা নিকাব পরিধান করা কেবলই কোনো ব্যক্তির আধুনিক পছন্দের বিষয় নয়; এটি কোটি কোটি মুসলিম নারীর নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস, দেশের সাংবিধানিক অধিকার এবং নাগরিক মর্যাদার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্রীয় স্তরে এই পোশাক নিয়ে সামান্যতম হাস্যরস, কুৎসিত বিদ্রুপ বা নিরাপত্তাজনিত সন্দেহ প্রকাশ করা নারীদের পবিত্র ধর্মীয় অনুভূতিতে গভীর আঘাত হানার শামিল।
সংগঠনটি দৃঢ়ভাবে মনে করে, নিজ নিজ ধর্মীয় পরিচয় রক্ষা করা ও পোশাক নির্বাচনের স্বাধীনতাকে যথাযথ সম্মান ও আইনি সুরক্ষা দেওয়া প্রতিটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র ও প্রগতিশীল সমাজের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
তবে সংসদ অধিবেশন চলাকালে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি উত্থাপনের সাথে সাথেই স্পিকারের পক্ষ থেকে যে তাৎক্ষণিক আপত্তি জানানো হয়েছে, তাকে অত্যন্ত ইতিবাচক ও সাধুবাদ যোগ্য হিসেবে উল্লেখ করেছে সাধারণ আলেম সমাজ। আলেমদের মতে, স্পিকারের এই কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থান মূলত সংসদীয় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধেরই এক অনন্য উদাহরণ।
নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করে ওলামা সংগঠনটি স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, বিতর্কিত ওই মন্তব্যটি যেন সংসদের স্থায়ী কার্যবিবরণী (প্রসিডিংস) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরোপুরি বাদ বা এক্সপাঞ্জ করা হয়। এর পাশাপাশি সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীকে অনতিবিলম্বে তাঁর এই অসংবেদনশীল মন্তব্যের জন্য প্রকাশ্যে দুঃখপ্রকাশ করতে হবে এবং পর্দানশীন নারীদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে।
বিবৃতির শেষাংশে ওলামা নেতৃবৃন্দ জোর দিয়ে বলেন, ধর্মীয় স্বাধীনতা, নাগরিক মর্যাদা ও মানবিক সম্মানের মতো স্পর্শকাতর প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করার সুযোগ নেই। তাঁরা এমন একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে কোনো নারী তাঁর ধর্মীয় পরিচয় বা শালীন পোশাকের কারণে রাষ্ট্র কিংবা সমাজের কোথাও বিন্দুমাত্র অপমানিত বা সন্দেহের মুখোমুখি হবেন না।