
রাজমিস্ত্রি ও ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রুশ সেনাবাহিনীর হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো হয়েছিল জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার দুই যুবককে। কিন্তু উন্নত জীবনের সেই স্বপ্ন রণক্ষেত্রের ড্রোন হামলায় চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। সোমবার (১৫ জুন) সকালে ওই দুই হতভাগ্য যুবকের পরিবার তাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
নিহতরা হলেন—মাদারগঞ্জ উপজেলার চর গুজামানিকা গ্রামের বাসিন্দা মাফল মিয়া (২৪) এবং রায়েরছড়া গ্রামের মো. আরিফ মিয়া (৩০)।
পারিবারিক ও স্থানীয় বাসিন্দা সূত্রে জানা গেছে, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে গত এপ্রিল মাসে স্থানীয় এক দালালের হাত ধরে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন এই দুই বাংলাদেশি যুবক। সেখানে নির্মাণশ্রমিক বা রাজমিস্ত্রির কাজ দেওয়ার কথা থাকলেও রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তারা এক আন্তর্জাতিক দালাল চক্রের খপ্পরে পড়েন। পরবর্তীতে তাদের জোরপূর্বক রুশ সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সম্প্রতি ইউক্রেনীয় বাহিনীর সাথে সম্মুখ সমরে পৃথক দুটি স্থানে শত্রুপক্ষের ড্রোন হামলায় তারা প্রাণ হারান। প্রথম দিকে তাদের মৃত্যুর খবরটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও রাশিয়ায় থাকা এক বাংলাদেশি প্রবাসীর মাধ্যমে পরিবারটি শেষ পর্যন্ত এই মর্মান্তিক খবর জানতে পারে।
নিহত মাফল মিয়ার বড় বোন কণিকা আক্তার নিজের ক্ষোভ ও আর্তনাদ প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের সংসার খুবই অভাবের। এলাকায় কোনো কাজের সুযোগ না থাকায় আমার ভাই বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এক দালালের মাধ্যমে রাজমিস্ত্রির কাজের আশ্বাস পেয়ে সে রাশিয়ায় গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে কোনো কাজ দেওয়া হয়নি। আমাদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ ছিল না। মাঝেমধ্যে ফোন করত। একবার ফোন করে জানিয়েছিল, তাকে কাজ না দিয়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে।"
অন্যদিকে উপজেলার সিধুলী ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. মোশারফ হোসেন দ্বিতীয় যুবকের বিষয়ে তথ্য দিয়ে জানান, আরিফ মিয়া আগে দেশে আনসার বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। আরও ভালো উপার্জনের আশায় সরকারি চাকরি ইস্তফা দিয়ে তিনি রাশিয়ায় যান। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে তিনিও মানবপাচারকারী দালালদের ফাঁদে পড়েন। যারা তাকে ভালো কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারা রাশিয়ায় নিয়ে তাকে সরাসরি দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে সোপর্দ করে। ফলশ্রুতিতে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও রুশ ফৌজের হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নামতে বাধ্য হন এবং ড্রোন হামলায় নিহত হন।
এই মর্মান্তিক ঘটনার বিষয়ে মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন চৌধুরী সংবাদমাধ্যমকে জানান, "নিখোঁজের বিষয়টি জেনেছি। শুনেছি তারা দূতাবাসের মাধ্যমে না গিয়ে স্থানীয় দালাল চক্রের মাধ্যমে বিদেশে গেছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব। ওই দুই যুবকের পরিবার লিখিত আবেদন করলে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"