
প্রস্তাবিত বাজেট সাধারণ করদাতাদের স্বস্তি দিতে ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি ‘কালো টাকা সাদা করার’ সুযোগ হিসেবে সমালোচিত স্বপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শনসংক্রান্ত বিধান প্রত্যাহারেরও সুপারিশ করেছেন।
সোমবার জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উদ্দেশে একাধিক সংশোধনী প্রস্তাব তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে প্রথমে বক্তব্য দেন বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান। পরে সংসদ নেতা হিসেবে বক্তব্য রাখেন তারেক রহমান।
বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “নরমালি দাবিটা বিরোধী দল থেকে হয়ে থাকে। আমি আপাতত ফিজিক্যালি না হলেও মানসিকভাবে তাদের পাশে গিয়ে কথা বলতে চাই।”
ব্যক্তিগত আয়কর অব্যাহতির সীমা বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে সাড়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি এই সীমা যথাক্রমে ৪ লাখ, সাড়ে ৪ লাখ এবং ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেন।
স্বপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শনসংক্রান্ত বিধান নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জমি প্রকৃত মূল্যে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে করদাতাদের হয়রানি কমানোর উদ্দেশ্যে বিধানটি আনা হলেও অনেকেই এটিকে ‘কালো টাকা সাদা করার’ সুযোগ হিসেবে দেখছেন। এজন্য তিনি সংশ্লিষ্ট বিধানটি প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
এ ছাড়া ব্যাংক হিসাব খোলা, বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন এবং সম্পত্তি নামজারির ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাই এসব ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেন সংসদ নেতা।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাবও দেন প্রধানমন্ত্রী। তবে এ সুবিধার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ভাষা শিক্ষা ও ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব স্থাপন এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর শর্ত আরোপের পরামর্শ দেন তিনি।
পার্বত্য ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য কর-সুবিধা আরও সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, তাদের ব্যবসা, কৃষি ও অন্যান্য আয়ের পাশাপাশি বেতনের আয়কেও করমুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
রপ্তানিমুখী চিংড়ি শিল্পের বিকাশে ফিড অ্যাডিটিভ, প্রোবায়োটিকস, ভিটামিন, মিনারেলস ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানিতে আরোপিত শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ওষুধ ও শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত মধু, পিইটি রেজিন, পিভিসি, কোল্ড-রোলড শিটসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর সুপারিশ করেন তিনি।
বৈদ্যুতিক তার তৈরিতে ব্যবহৃত কপার আমদানিতে ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার এবং অপ্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম আমদানিতে প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ কাস্টম শুল্ক কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাবও দেন তিনি।
ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে আনুষ্ঠানিক লেনদেন উৎসাহিত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সার্চ ইঞ্জিন ও অনলাইন মার্কেটপ্লেসে বিজ্ঞাপন প্রচারের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, এতে অনানুষ্ঠানিক অর্থপ্রদানের প্রবণতা কমবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।
এ ছাড়া স্বর্ণ, প্লাটিনাম, হীরা ও রূপার গহনার ওপর বিদ্যমান করহার পুনর্নির্ধারণ, বিটিআরসির সঙ্গে টেলিকম অপারেটরদের রাজস্ব ভাগাভাগির ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার এবং মাঠ সরবরাহে সরবরাহকারী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতির সুপারিশ করেন তিনি।
স্থানীয়ভাবে ডাবল কেবিন পিকআপ ও মাইক্রোবাস উৎপাদনের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ করার পাশাপাশি এলইডি ল্যাম্প ও প্রি-ফেব্রিকেটেড ভবন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোরও প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী।
বক্তব্যের একপর্যায়ে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান সাইকেলের ওপর আরোপিত সব ধরনের শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বলেন, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সমর্থন পেলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে উত্থাপিত দাবিগুলো আরও পূর্ণতা পাবে।
জবাবে সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, “এইমাত্র বিরোধী দলের নেতা উনাদের অবস্থান থেকে একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। আমি অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করব এই প্রস্তাবটি সকল কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যতটুকু বিবেচনা করা যায়, উনি বিবেচনা করবেন।”