
বিগত শাসননামলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও বৈষম্যের শিকার হওয়া সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের ক্ষোভ ও বঞ্চনার অবসান ঘটাতে ঐতিহাসিক এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত, অপসারিত, অব্যাহতিপ্রাপ্ত এবং বরখাস্ত হওয়া ১৫০ জন কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি ও বিশেষ আর্থিক সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
গত বুধবার (১ জুলাই) প্রতিরক্ষা সচিব মো. আশরাফ উদ্দিনের স্বাক্ষর করা এক বিশেষ প্রজ্ঞাপনে এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
দীর্ঘ ১৫ বছরের বঞ্চনার অবসান
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে তিন বাহিনীতে যারা অন্যায়, অবিচার ও রাজনৈতিক আক্রোশের শিকার হয়েছিলেন, তাদের আবেদনসমূহ দীর্ঘ পর্যালোচনার পর সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে। সুবিধা পাওয়া মোট ১৫০ জন কর্মকর্তার মধ্যে রয়েছেন সেনাবাহিনীর ১১৫ জন, নৌবাহিনীর ২১ জন এবং বিমানবাহিনীর ১৪ জন।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অধিকাংশ কর্মকর্তার অন্যায় বাধ্যতামূলক বা অকাল অবসর বাতিল করে বয়সসীমা পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত চাকরি বহাল ধরে স্বাভাবিক অবসর হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এর পাশাপাশি অনেককে লেফটেন্যান্ট জেনারেল, মেজর জেনারেল, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও কর্নেল পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে। ফলে তাঁরা সংশোধিত পদমর্যাদা অনুযায়ী চাকরির মেয়াদ পর্যন্ত বকেয়া বেতন-ভাতা ও বিধি মোতাবেক অন্যান্য আর্থিক সুবিধা লাভ করবেন।
শুধু তাই নয়, কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষতিপূরণও নির্ধারণ করেছে সরকার। যোগ্যতা ও পদ অনুযায়ী কাউকে এককালীন ৩০ লাখ, কাউকে ৫০ লাখ এবং কাউকে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রচলিত নীতিমালা মেনে সরকারি কিংবা বাহিনীর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। বয়স ও যোগ্যতা থাকা সাপেক্ষে অনেককে সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নতুন করে পদায়নের সুযোগও রাখা হয়েছে।
লে. জেনারেল হলেন আবদুল্লাহিল আমান আযমী
বিশেষ সুবিধা পাওয়া কর্মকর্তাদের তালিকায় অন্যতম আলোচিত নাম ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী। তাকে ২০০৯ সালের ২৪ জুন বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল।
নতুন প্রজ্ঞাপন অনুসারে, আবদুল্লাহিল আমান আযমীকে ২০১১ সালের ২৬ ডিসেম্বর ভূতাপেক্ষ মেজর জেনারেল এবং ২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর অবসরের পূর্বকালীন সময়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও মেজর জেনারেল—উভয় পদের বকেয়া বেতন-ভাতা, বিধি অনুযায়ী অন্যান্য সব আর্থিক সুবিধা এবং এক কোটি টাকা বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা পাবেন। একই সঙ্গে বয়স ও যোগ্যতা বিবেচনা করে তাকে সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের সামরিক সচিব লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আমিনুল করিমকে ২০০৯ সালের ১২ মার্চ বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। সংশোধিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তাঁর অবসর বাতিল করে ২০১২ সালের ৩০ জুন স্বাভাবিক অবসর দেখানো হয়েছে। ফলে তিনি ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদমর্যাদার বকেয়া বেতন, ভাতা এবং অন্যান্য পূর্ণ আর্থিক সুবিধা পাবেন।
উচ্চপর্যায়ের কমিটির সুপারিশে প্রজ্ঞাপন
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও তিন বাহিনীর সদরদপ্তরের গঠিত ভিন্ন ভিন্ন পর্ষদের প্রাথমিক মূল্যায়নের পর চলতি বছরের ৩ মে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতিবিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। উক্ত কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশ এবং তিন বাহিনীর সদরদপ্তরের মতামতের ভিত্তিতেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই বিশদ বিবরণীসহ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।