
রাজধানীর গুলশানে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের দুটি ফ্ল্যাটে আদালতের নির্দেশে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ বিলাসবহুল সামগ্রীর খোঁজ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রথম দিনের তালিকা তৈরির কাজেই পাওয়া গেছে প্রায় ৩০০টি কোট, ৫৩২টি টাই, রোলেক্স ঘড়ির বক্স, মার্সিডিজ বেঞ্জসহ আটটি বিলাসবহুল গাড়ির চাবি, মুক্তার গহনা ও ঝাড়বাতিসহ নানা মূল্যবান সামগ্রী।
রোববার (১৯ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে গুলশান-২-এর ৬৬ নম্বর সড়কে অবস্থিত ফ্ল্যাট দুটিতে অভিযান শুরু করে দুদক। অভিযানে পুলিশ সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আখতারুল ইসলাম জানান, আদালতের অনুমোদন অনুযায়ী দুদকের উপপরিচালক মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বে একটি যৌথ দল ফ্ল্যাট দুটিতে থাকা সম্পদের ইনভেন্টরি তৈরি করছে। আদালতের নির্দেশ অনুসারে ফ্ল্যাট দুটি দুদকের নিয়োজিত রিসিভারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
দুদকের উপপরিচালক মো. মশিউর রহমান জানান, প্রথম দিনের অভিযানে দুই ফ্ল্যাট থেকে প্রায় ৩০০টি কোট, ৫৩২টি টাই, রোলেক্সের চারটিসহ মোট আটটি ঘড়ির বক্স, তিন সেট মুক্তার গহনা, চারটি ঝাড়বাতি, বেড, সোফা এবং প্রায় ১০০ সেট কামিজের তালিকা করা হয়েছে। সোমবারও ইনভেন্টরির কাজ চলবে। এরপর প্রস্তুত করা হবে সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা।
অভিযানসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রায় সাড়ে সাত হাজার বর্গফুট আয়তনের দুটি ফ্ল্যাট আদালতের ক্রোক আদেশ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দখলে নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও গুলশান থানা পুলিশের উপস্থিতিতে তালা ভেঙে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করা হয়। সেখানে মার্সিডিজ বেঞ্জসহ আটটি বিলাসবহুল গাড়ির চাবি এবং তদন্তসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আলামত পাওয়া গেছে। তবে অনেক মূল্যবান সামগ্রী আগেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে দুদক।
অভিযানের সময় একটি বিলাসবহুল রোলেক্স ঘড়ির ওয়ারেন্টি কার্ডও উদ্ধার করা হয়। কার্ডের তথ্য অনুযায়ী, এটি ১৮ ক্যারেট হোয়াইট গোল্ডের রোলেক্স সেলিনি (মডেল-৫০৫১৯)। ঘড়িটি ২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি লন্ডনের হ্যার্ডস ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে কেনা হয়েছিল। ওয়ারেন্টি কার্ডে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নাম, মডেল নম্বর ও সিরিয়াল নম্বর উল্লেখ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ঘড়ির বাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, একই মডেলের ব্যবহৃত ঘড়ির বর্তমান বাজারমূল্য ১৩ থেকে ১৭ হাজার মার্কিন ডলারের মধ্যে। আর নতুন অবস্থায় এর দাম প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার, যা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২১ লাখ টাকার সমান।
দুদক জানিয়েছে, ফ্ল্যাট দুটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে সংস্থাটির সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ। আদালতের পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী সম্পত্তিগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। সংস্থাটির দাবি, তার বিরুদ্ধে বিশ্বের নয়টি দেশে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা পাচারের প্রমাণ এবং ৩০টি মামলায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এর আগে আদালত যুক্তরাজ্যে তার নামে থাকা ৫১৮টি ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট ক্রোক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আটটি দেশে থাকা ৩৩০টি বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে তার নামে থাকা দুটি কোম্পানিতে করা বিনিয়োগও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে থাকা এসব সম্পদ ও বিনিয়োগের মোট মূল্য প্রায় ২ হাজার ৩২০ কোটি ৯২ লাখ টাকা।