
সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও সহযোগী সংগঠনের সাবেক নেতাদের একযোগে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকে ঘিরে প্রশাসনের ভেতরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিবসহ ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সরকারি সিদ্ধান্তে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা প্রশাসন ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তার মধ্যে অসন্তোষ, উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখা বৃহস্পতিবার পৃথক ১২টি প্রজ্ঞাপন জারি করে এসব নিয়োগ দেয়। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদ ছাড়া বাকি ১১টি পদই গ্রেড-২ মর্যাদার, যা প্রশাসনিক কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তর হিসেবে বিবেচিত।
যেসব পদে নিয়োগ
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে মো. সামসুল আলম, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক হিসেবে মো. সালাহউদ্দিন সরকার এবং বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে মোহাম্মদ রাশেদুল হক নিয়োগ পেয়েছেন।
এছাড়া বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান হয়েছেন মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান এ টি এম আবদুল বারী ড্যানী, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব কামরুজ্জামান, বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান আবদুল খালেক, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান (সুরুজ), বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম (টিপু), বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান জাকির সিদ্দিকি, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ এবং বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান মামুন হাসান।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, যোগদানের তারিখ থেকে এক বছরের জন্য এসব নিয়োগ কার্যকর হবে। এ সময়ে তারা অন্য কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি, ব্যবসা বা পেশায় যুক্ত থাকতে পারবেন না।
রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে আলোচনা
নিয়োগপ্রাপ্তদের একটি বড় অংশ বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি বা সহযোগী সংগঠনের সাবেক বা বর্তমান নেতা হওয়ায় বিষয়টি প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, বোয়েসেলের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাশেদুল হক বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক। বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বিএনপির কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক এবং বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান এ টি এম আবদুল বারী ড্যানী বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক।
এছাড়া জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব কামরুজ্জামান জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক দপ্তর সম্পাদক ও সহসভাপতি, বিএসইসির চেয়ারম্যান আবদুল খালেক বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম (টিপু) বিএনপির কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশবিষয়ক সহ-সম্পাদক, তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান জাকির সিদ্দিকি যুবদলের সাবেক সহসভাপতি, বিসিক চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান মামুন হাসান যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলেন।
পদোন্নতি নিয়ে ক্ষোভ
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ পদে ধারাবাহিকভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ফলে নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে বলে অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রশাসন ক্যাডারের একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, একজন কর্মকর্তা ২৫ থেকে ৩০ বছর চাকরি করার পর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান হওয়ার প্রত্যাশা করেন। কিন্তু বাইরের কাউকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হলে স্বাভাবিকভাবেই হতাশা তৈরি হয়।
আরেক কর্মকর্তা বলেন, পদোন্নতি শুধু ব্যক্তিগত সুবিধার বিষয় নয়; এটি পুরো ক্যাডার ব্যবস্থার মনোবল ও পেশাগত অনুপ্রেরণার সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করা হলে প্রশাসনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আইনে সুযোগ থাকলেও ‘ব্যতিক্রম’ হওয়া উচিত
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৯ ধারায় বিশেষ দক্ষতা, অভিজ্ঞতা বা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনের ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে এটিকে নিয়মিত চর্চায় পরিণত করা হলে প্রশাসনিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সরকারি ব্যবস্থায় নতুন নয়, তবে এটি ব্যতিক্রম হিসেবেই থাকা উচিত। মেধা, অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত না হলে নিয়মিত কর্মকর্তাদের মনোবল ক্ষুণ্ন হতে পারে। একই সঙ্গে কোন মানদণ্ডে এ ধরনের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে সরকারের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, যথাযথ দক্ষতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বিবেচনা না করে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তার মতে, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট খাতে অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
অন্যদিকে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও দীর্ঘদিনের পারস্পরিক দ্বন্দ্বও বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশে দায়ী। তার মতে, অতীতেও রাজনৈতিক বিবেচনায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের নজির ছিল। তবে এবার সংখ্যাটি তুলনামূলক বেশি। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত এসব নিয়োগের সাফল্য নির্ভর করবে নিয়োগপ্রাপ্তদের সততা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ওপর।
সরকারের অবস্থান
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর দাবি, সংশ্লিষ্ট খাতে অভিজ্ঞতা, জনসম্পৃক্ততা, সংস্কার বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং বিশেষ দক্ষতার ভিত্তিতেই এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম গতিশীল করাই এ সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য বলে তারা জানিয়েছেন।
তবে জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ব্যতিক্রমী নিয়োগের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রকাশ্যে তুলে ধরা হলে প্রশাসনের ভেতরের বিতর্ক ও অসন্তোষ অনেকটাই কমানো সম্ভব।