
দেশের সম্ভাব্য প্রতিটি নাগরিককে ধাপে ধাপে সামাজিক সুরক্ষা ও আর্থিক সহায়তার আওতায় আনতে সরকার পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ জন্য বাস্তবায়নের একটি সুপরিকল্পিত রোডম্যাপও তৈরি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সোমবার (১০ আগস্ট) রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এসডিজি ভিলেজ পাইলট প্রোগ্রামের আওতায় তিনটি এসডিজি গ্রামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার মিতিঙ্গাছড়ি, খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী এবং দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগরকে এ কর্মসূচির আওতায় নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশ যেভাবে মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) বাস্তবায়নে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছিল, একইভাবে সাস্টেইন্যাবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি) বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ যথাযথভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করে চলছে।”
তিনি বলেন, “জনগণের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত অর্থনৈতিক কাঠামো বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিয়েছে । এই ফ্রেমওয়ার্ক দেশের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনাকে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির সঙ্গে সমন্বিত করেছে। সংস্কার ও উন্নয়নের পাঁচ স্তম্ভের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, জেন্ডার সমতা এবং জলবায়ু সহনশীলতা এবং সুশাসন এসডিজির এই মূল অগ্রাধিকারগুলোই প্রতিফলিত হয়েছে।”
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ এবং এসডিজি বাস্তবায়নে দেশের অর্জন ধরে রাখতে সরকার ‘পুনরুদ্ধার-পুনর্বাসন-পুনর্গঠন’ বা Recovery, Rehabilitation, and Reconstruction—থ্রি-আর কৌশল গ্রহণ করেছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক স্থিতিশীলতা থেকে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন পর্যন্ত বিভিন্ন উদ্যোগ একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পরদিন থেকেই নারীর সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় কৃষক কার্ড, জনস্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা সেবা সহজ করতে ই-হেলথ কার্ডের মতো একাধিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাস্তবায়ন চলছে। এর মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষক, স্বল্প আয়ের পরিবার ও ঝুঁকিপূর্ণজনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি ভর্তুকি, কৃষি উপকরণ, আর্থিক সহায়তা এবং স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি স্পোর্টস কার্ড, সারাদেশে ইমাম মুয়াজ্জিন এবং বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয়গুরুদেরকেও সম্মানী ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। কোনও না কোনও উপায়ে দেশের প্রতিটি শ্রেণি পেশার মানুষের কাছে সরকারের সহায়তা নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হচ্ছে।”
চলতি মেয়াদেই ধাপে ধাপে দেশের সম্ভাব্য প্রতিটি মানুষকে সামাজিক সুরক্ষা ও আর্থিক সহায়তা কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এ জন্য বাস্তবায়নের একটি সুপরিকল্পিত পথনকশা তৈরি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী জানান, এসডিজি ভিলেজ কর্মসূচির পরীক্ষামূলক মডেল হিসেবে প্রাথমিকভাবে তিনটি গ্রাম নির্বাচন করা হয়েছে। এগুলো হলো রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার মিতিঙ্গাছড়ি, খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী এবং দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগর।
নির্বাচিত গ্রামগুলোতে একই সঙ্গে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড, কৃষক কার্ড, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে ঋণ, স্কুল ড্রেস, মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্রাম পর্যটন, ব্লু এমপ্লয়মেন্ট, ওয়ান ভিলেজ-ওয়ান প্রোডাক্ট, বৃক্ষরোপণ, খাল খনন ও ইকোট্যুরিজম। এসব কার্যক্রমের প্রভাবও পর্যবেক্ষণ করা হবে।
তিনি বলেন, এই পাইলট উদ্যোগ সফল হলে পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য গ্রামেও মডেলটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, “আমি আশা করি এসডিজি ভিলেজ বর্তমান সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকারকে একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ডেভেলপমেন্ট মডেল’ হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার একটি দৃষ্টান্তমূলক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠবে।”
এসডিজি বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “কোনও একক মন্ত্রণালয় বা বিভাগের মাধ্যমে এসডিজি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত সহযোগিতা। আশা করি, তিন দিনের এই সম্মেলনে প্রতিটি সমন্বয়কারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের অভীষ্টভিত্তিক অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত এবং সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।”
এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন আয়োজনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক ও গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিট এবং বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।