
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী সপ্তাহের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি সফর করতে পারেন। সম্ভাব্য এই সফরকে সামনে রেখে ঢাকা ও নয়াদিল্লিতে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। এ বিষয়ে দুই দেশের রাজধানী ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
পরিকল্পনা অনুযায়ী সফরটি হলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি হবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর। ফলে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সফরটিকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্ভাব্য সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হতে পারে। বৈঠকে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, তারেক রহমানের সফরটি দুই দিনের দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবেই পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে সফরের নির্দিষ্ট তারিখ ও কর্মসূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারিতেই তারেক রহমানকে নয়াদিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত। এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনেও বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে দেশটি।
নরেন্দ্র মোদি ও তারেক রহমানের সম্ভাব্য বৈঠকের দিকে বিশেষ নজর রয়েছে দুই দেশেরই। তারেক রহমানের ক্ষমতায় ফেরার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন এসেছে। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ভারতকে নতুন কৌশল নির্ধারণ করতে হচ্ছে।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান এবং তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধসহ বেশ কয়েকটি ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
তবে নতুন বিএনপি সরকার ভারতের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগও বেড়েছে। গত এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নয়াদিল্লি সফর করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এরপর ১০ আগস্ট ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই আলোচনায় দুই দেশের সম্পর্কের পরিবেশ উন্নত করার বিভিন্ন উপায় নিয়ে কথা হয়েছে বলে জানা গেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ ছাড়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের একটি ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর তাকে দেশে ফেরত পাঠাতে নয়াদিল্লির কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা।
ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধটি যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
চলতি মাসের শুরুতে নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি কথা বলার পর শেখ হাসিনার বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা ক্ষোভ জানিয়ে বলেছে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করা উচিত নয়। তবে ওই আয়োজনের সঙ্গে ভারতের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
সূত্রের দাবি, তারেক রহমান ও ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক বৈঠকেও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি উঠে আসে। দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের স্বার্থে এই বিরোধ যাতে অন্য ক্ষেত্রগুলোকে প্রভাবিত না করে, সে বিষয়ে উভয় পক্ষকে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার অপেক্ষায় থাকা আরও কিছু বিষয় রয়েছে। সম্ভাব্য শীর্ষ বৈঠকে বাণিজ্য ও ট্রানজিট, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং যোগাযোগব্যবস্থা গুরুত্ব পেতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও পরিবহন যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি হলে এসব খাতেও তার ইতিবাচক প্রভাব দ্রুত পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের কাছ থেকে আরও সহযোগিতা চেয়ে আসছে বাংলাদেশ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। অভিন্ন সীমান্তের পাশাপাশি বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নয়াদিল্লি ঢাকার সঙ্গে সুসম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়।
দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার আগ্রহের মধ্যেই তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর হতে যাচ্ছে। তবে এই সফরেই দুই দেশের সব বিরোধের সমাধান হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা করা হচ্ছে না।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ও সীমান্তসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভবিষ্যতেও আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।
তবে নরেন্দ্র মোদি ও তারেক রহমানের সরাসরি বৈঠক এসব মতপার্থক্য কমাতে রাজনৈতিক যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ভারতের নেতৃত্বের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ পাবেন তারেক রহমান। বিপরীতে নতুন বাংলাদেশ সরকারের কাছে ভারতের প্রত্যাশাগুলোও সরাসরি তুলে ধরতে পারবেন নরেন্দ্র মোদি।
সফরের তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী সপ্তাহে সফরটি হলে, ভারত-বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। এই মুহূর্তে দুই দেশের মূল লক্ষ্য—সরাসরি আলোচনা পুনরায় শুরু করা এবং কঠিন ইস্যুগুলোকে সামগ্রিক সম্পর্কের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে না দেওয়ার উপায় খুঁজে বের করা।