
দেশে সারের কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছেন কৃষি ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তবে মন্ত্রীর এই দাবির সঙ্গে মাঠপর্যায়ের চিত্রের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষকদের অভিযোগ, চাহিদা অনুযায়ী সার মিলছে না। আবার কোথাও সার পাওয়া গেলেও সরকার-নির্ধারিত দামের চেয়ে ১৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কৃষকেরা। দ্রুত সমস্যা সমাধানের দাবি জানিয়েছেন তারা।
গতকাল শনিবার দুপুরে ফরিদপুরে কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী সারের সংকট না থাকার কথা জানান। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
খরচ তুলতে দুশ্চিন্তা
ময়মনসিংহে কৃষকদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রির কথা থাকলেও অনেক ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন। ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও পটাশ সার কিনতে গিয়ে তাদের বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। কোনো কোনো জায়গায় সার নেই জানিয়ে কৃষকদের ফিরিয়ে দেওয়া হলেও পরে একই সার বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
কৃষকেরা জানান, আমন মৌসুমে ধান উৎপাদনের ব্যয় এমনিতেই বেড়েছে। তার ওপর সারের জন্য বাড়তি অর্থ দিতে হওয়ায় তাদের আর্থিক চাপ আরও বাড়ছে। ফলে উৎপাদন খরচ তুলে আনাই কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
কৃষকদের দাবি, বাজার এবং ডিলার পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি জোরদার করা হলে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির প্রবণতা বন্ধ করা সম্ভব।
ময়মনসিংহের ১৩ উপজেলাতেই সারের একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। হালুয়াঘাট উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নের স্কুলশিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সার অতিরিক্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। আমি আমার ইউনিয়ন ডিলারের কাছে সার কিনতে গেলে তিনি বলেন সার নেই। অথচ খোলাবাজারে অতিরিক্ত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে। ডিলারকে বস্তাপ্রতি কয়েক শ টাকা অতিরিক্ত দিলে মেলে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. এনামুল হক বলেন, চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে এবং সরবরাহও স্বাভাবিক। তাই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি দামে সার বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। এমন অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি স্থানে অভিযান চালিয়ে সার জব্দ করার পাশাপাশি জরিমানাও করা হয়েছে।
বাড়তি দামে ক্ষোভ
যশোরে চলতি মৌসুমে সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। যদিও কৃষকদের বক্তব্য, প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে তাদের। এ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি আমন মৌসুমে যশোরে ১ লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আগস্ট মাসে ওই জমির জন্য ১০ হাজার ৭০৪ টন ইউরিয়া, ৩ হাজার ৮২ টন টিএসপি, ২ হাজার ৭৮২ টন ডিএপি এবং ২ হাজার ৬৩১ টন এমওপি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এর মধ্যে ৮ হাজার ৫৩৪ টন ইউরিয়া, ২ হাজার ৮১০ টন টিএসপি, ২ হাজার ১৪০ টন ডিএপি এবং ২ হাজার ২৩১ টন এমওপি উত্তোলন করা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কৃষক পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত ৫০ কেজির এক বস্তা টিএসপির খুচরা মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা। একই পরিমাণ এমওপি বিক্রি হওয়ার কথা ১ হাজার টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা এবং ইউরিয়া ১ হাজার ৩৫০ টাকা দরে।
চৌগাছা উপজেলার আন্দুলিয়া গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘দুই বস্তা কিনতে চাইলে এক বস্তা পাওয়া যাচ্ছে। এরপরও সরকার-নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না।’
ঝিকরগাছা উপজেলার নারাঙ্গালী গ্রামের কৃষক মো. আবদুল আলিম বলেন, ‘অনেক ঘুরে খোলাবাজার থেকে প্রতি কেজি ৫২ টাকা দরে ২০ কেজি টিএসপি কিনে জমিতে দিয়েছি। এ ছাড়া ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে দুই বস্তা ইউরিয়া কিনেছি।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোর কার্যালয়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, জেলায় সারের কোনো সংকট নেই। তবে কিছু ডিলার কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন।
মেহেরপুরের গাংনীতেও সার সংকটের খবর পাওয়া গেছে। সেখানে সরকার নির্ধারিত ইউরিয়ার দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা এবং ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা হলেও বাজারে এগুলো যথাক্রমে ১ হাজার ৫৫০ টাকা, ১ হাজার ৯০০ টাকা এবং ১ হাজার ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
ধানচাষি আলতাব হোসেন বলেন, ‘খুচরা দোকানে গিয়ে ইউরিয়া, ডিএপি ও টিএসপি সার পাচ্ছি। কিন্তু দাম দেখে মাথা ঘুরে যাচ্ছে। ডিলারদের কাছে সার নিতে গেলে আমরা পাই না। চাষির কান্নাও কেউ দেখে না।’
সারের কোনো সংকট নেই: মন্ত্রী
দেশে সারের কোনো সংকট নেই দাবি করে কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, ষড়যন্ত্র করে সারের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
মন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। আগামী তিন বছরের মধ্যে কৃষিপণ্যে স্বয়ংসম্পন্ন হয়ে রপ্তানি করার লক্ষ্যও সরকারের রয়েছে।
গতকাল দুপুরে ফরিদপুরে কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন মন্ত্রী। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সভায় তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিবছর যে পরিমাণ সারের প্রয়োজন হয়, সরকার তার থেকে কমপক্ষে ১৬ লাখ টন সার অতিরিক্ত আমদানি করে থাকে। এবারও সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কিন্তু কিছু দুষ্কৃতকারী ষড়যন্ত্র করে সারের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। কৃষক গেলে বলে সার নেই, যখন বলে এই কয় টাকা বেশি দেব, তখন বলে সার আছে। অতিলোভী কিছু ব্যবসায়ী ষড়যন্ত্র করার চেষ্টা করছে।’