
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি সই হওয়া ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’কে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে না তেহরান। একইসঙ্গে চুক্তিটিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়ে ঢাকার সিদ্ধান্ত নিয়েও ইরানের কোনো উদ্বেগ নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত ড. জলিল রহিমি জাহানাবাদি।
বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
‘বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নিয়েও আমাদের উদ্বেগ নেই’
ইরানের রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমরা মক্কা শান্তি চুক্তিকে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো উদ্যোগ মনে করি না। বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নিয়েও আমাদের উদ্বেগ নেই।’
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে তেহরানের অবস্থান তুলে ধরে জাহানাবাদি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঢাকার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান সম্পর্কে ইরান অবগত।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা ভালোভাবেই জানি যে, আপনাদের সরকার অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে।’
আন্তর্জাতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত বিষয়ে বাংলাদেশ যেকোনো সিদ্ধান্ত নিলেও সেটিকে ইরানের জন্য উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখা হবে না বলেও জানান রাষ্ট্রদূত।
বাংলাদেশ-ইরান সম্পর্ক আরও জোরদারের আগ্রহ
দুই দেশের সম্পর্কের বিষয়ে ইরানের আগ্রহের কথা জানিয়ে জাহানাবাদি বলেন, ‘বাংলাদেশ-ইরান সম্পর্ককে তেহরান গুরুত্ব দেয় এবং রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বাড়াতে আমরা আগ্রহী।’
এ সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের পাশাপাশি ওই অঞ্চলের বাইরের মানুষের স্বার্থের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি আঞ্চলিক উত্তেজনা দ্রুত কমিয়ে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেরাই নিতে চায় আঞ্চলিক দেশগুলো
ইরানের রাষ্ট্রদূতের মতে, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিরাপত্তা ভাবনায় পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্ট করেছে।
তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে যে, দেশগুলো তাদের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে একে অপরের ওপর নির্ভরতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।’
জাহানাবাদি বলেন, আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজেদের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করার চেষ্টা করছে। শান্তি চুক্তিগুলোও তার প্রমাণ। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, নিজেদের নিরাপত্তার জন্য তারা আর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে চায় না।
‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে না’
সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ইরানের রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে না।’
এ কারণে বাইরের কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদেরই নেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন জাহানাবাদি।
তার ভাষ্য, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগগুলো বৃহত্তর কৌশলগত স্বাধীনতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্যোগকে হুমকি হিসেবে দেখছে না ইরান
পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘এ ধরনের উদ্যোগকে ইরান প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আঞ্চলিক দেশগুলোর অন্যদের সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি না করে নিজেদের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা করতে সক্ষম হওয়া উচিত।’
‘মক্কা বাংলাদেশের হৃদয়ে’
এর আগে গত রোববার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছিলেন, ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে বাংলাদেশ যুক্ত হলে কোনো ঝুঁকি দেখছে না ঢাকা। আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার আলোকে এই উদ্যোগকে ‘অনন্য’ ও নতুন একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর এইচ বিন আবিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের পর সেদিন সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘এটি একটি অনন্য উদ্যোগ। এগুলো নতুন সুযোগ।’
বর্তমান বিশ্বের অস্থিরতা ও সংকটপূর্ণ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে সমন্বিত এবং নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মক্কা প্রতিরক্ষা উদ্যোগের প্রতি বাংলাদেশের ইতিবাচক মনোভাবের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে হুমায়ুন কবির আরও বলেছিলেন, ‘মক্কা বাংলাদেশের হৃদয়ে।’
চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি ঢাকা
তবে মঙ্গলবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত ‘মক্কা চুক্তি’তে বাংলাদেশ যোগ দেবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছে সরকার।
জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশ এখনো চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পায়নি।’
৭ আগস্ট চুক্তিতে সই করে তিন দেশ
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে সই করে।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।