
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অর্থপাচারের মাধ্যমে সম্পদ গড়ার অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, সাবেক প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল ও সাবেক পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাতসহ ৭৩ বাংলাদেশির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
অভিযোগের বিষয়ে আরও তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের প্রস্তুতি নিচ্ছে দুদক। এ জন্য জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনের (ইউএনসিএসি) আওতায় মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দুর্নীতি ও আর্থিক অপরাধের তদন্তে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তথ্য ও নথি আদান-প্রদানের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে এই প্রক্রিয়া ব্যবহৃত হয়।
দুবাইয়ের অভিজাত এলাকায় সম্পদের তথ্য
দুদকের অনুসন্ধানে থাকা ৭৩ বাংলাদেশির কয়েকজন দুবাইয়ের অভিজাত এলাকা দুবাই মেরিনা ও পাম জুমেইরাহতে ফ্ল্যাট ও বাড়ি কিনেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সংযুক্ত আরব আমিরাতের গোল্ডেন ভিসাও নিয়েছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
দুদকের উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) আখতারুল ইসলাম জানান, দুবাইয়ে অর্থপাচারের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগের বিষয়ে তথ্য চেয়ে অনুসন্ধানকারী দল সম্প্রতি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে চিঠি দিয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর থেকে সংশ্লিষ্ট ৭৩ ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ করেছে দুদক। এসব তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পর অধিকতর অনুসন্ধানের জন্য তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে।
দুদকের উপ-পরিচালক আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে বিশেষ দলটি এই অনুসন্ধান পরিচালনা করছে। দলের সদস্য হিসেবে রয়েছেন সহকারী পরিচালক আশিকুর রহমান।
অনুসন্ধানের তালিকায় যারা
দুদকের অনুসন্ধানাধীন ৭৩ ব্যক্তির তালিকায় রয়েছেন—সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এইচবিএম ইকবাল, চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, আহসানুল করিম, আনজুমান আরা শহীদ, হুমায়রা সেলিম, জুরান চন্দ্র ভৌমিক, মো. রাব্বি খান, মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা, মোহাম্মদ ওলিউর রহমান, এসএ খান ইখতেখুরুজ্জামান, সৈয়দ ফাহিম আহমেদ, সৈয়দ হাসনাইন, সৈয়দ মাহমুদুল হক, সৈয়দ রুহুল হক, গোলাম মোহাম্মদ ভূঁইয়া, হাজি মোস্তফা ভূঁইয়া, মনোজ কান্তি পাল, মো. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, মো. মাহবুবুল হক সরকার, মো. সেলিম রেজা, মোহাম্মদ ইলিয়াস বজলুর রহমান, এসইউ আহমেদ, শেহতাজ মুনশি খান, একেএম ফজলুর রহমান, আবু ইউসুফ মো. আবদুল্লাহ, গুলজার আলম চৌধুরী, হাসান আশিক তাইমুর ইসলাম, হাসান রেজা মাহিদুল ইসলাম, খালেদ মাহমুদ, এম সাজ্জাদ আলম, মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী, মোস্তফা আমির ফয়সাল, রিফাত আলী ভূঁইয়া, সালিমুল হক ঈসা/হাকিম মোহাম্মদ ঈসা, সৈয়দ একে আনোয়ারুজ্জামান/সৈয়দ কামরুজ্জামান, সৈয়দ সালমান মাসুদ, সৈয়দ সাইমুল হক, আবদুল হাই সরকার, আহমেদ সামির পাশা, ফাহমিদা শবনম চৈতি, মো. আবুল কালাম, ফাতেমা বেগম কামাল, মোহাম্মদ আল রুমান খান, মাইনুল হক সিদ্দিকী, মুনিয়া আউয়াল, সাদিক হোসাইন মো. শাকিল, আবদুল্লাহ মামুন মারুফ, মোহাম্মদ আরমান হোসাইন, মোহাম্মদ শওকত হোসাইন সিদ্দিকী, মোস্তফা জামাল নাসের, আহমেদ ইমরান চৌধুরী, বিল্লাল হোসাইন, এমএ হাসেম, মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন চৌধুরী, নাতাশা নূর মুমু, সৈয়দ মিজান মোহাম্মদ আবু হানিফ সিদ্দিকী, সায়েদা দুররাক সিন্ডা জারা, আহমেদ ইফফজাল চৌধুরী, ফারহানা মোনেম, ফারজানা আনজুম খান, কে এইচ মশিউর রহমান, এমএ সালাম, মো. আলী হোসাইন, মোহাম্মদ ইমদাদুল হক ভূঁইয়া, মোহাম্মদ ইমরান, মোহাম্মদ রোহেন কবির, মঞ্জিলা মুর্শেদ, মোহাম্মদ সানাউল্লাহ চৌধুরী, মোহাম্মদ সারফুল ইসলাম, সৈয়দ রফিকুল আলম ও আনিসুজ্জামান চৌধুরী।
তবে অনুসন্ধান চলমান থাকায় তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের পেশাগত পরিচয় প্রকাশ করেনি দুদক।
৪৫৯ বাংলাদেশির সম্পদের অভিযোগ থেকে অনুসন্ধানের শুরু
দুবাইয়ে বাংলাদেশিদের সম্পদ নিয়ে দুদকের এই অনুসন্ধানের পেছনে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের একটি নির্দেশনা। ২০২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি আদালত দুদকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দুবাইয়ে ৪৫৯ বাংলাদেশি নাগরিকের সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেন।
সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজ (সিফোরএডিএস) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ট্যাক্স অবজারভেটরির উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল পর্যন্ত দুবাইয়ে ৪৫৯ বাংলাদেশি নাগরিকের মালিকানায় ৯৭২টি সম্পত্তি ছিল। এসব সম্পত্তির নথিভুক্ত মূল্য প্রায় ৩১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এর আগে ২০২২ সালের মে মাসে প্রকাশিত সিফোরএডিএসের একটি গবেষণায় এসব সম্পত্তির মোট মূল্য প্রায় ৩১৫ মিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
মেরিনা ও পাম জুমেইরাহতে সম্পত্তি
ওই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশিদের মালিকানাধীন সম্পত্তির মধ্যে ৬৪টি দুবাই মেরিনায় এবং ১৯টি পাম জুমেইরাহতে অবস্থিত। এ ছাড়া বাংলাদেশিদের মালিকানায় অন্তত ১০০টি ভিলা ও পাঁচটি ভবন থাকার তথ্যও পাওয়া যায়।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, চার থেকে পাঁচজন বাংলাদেশির সঙ্গে প্রায় ৪৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পত্তির যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
দুবাইয়ে অর্থপাচারের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বর্তমানে অনুসন্ধানাধীন ৭৩ বাংলাদেশির বিষয়ে এসব তথ্য ও নথি যাচাই করছে দুদক। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে নথি পাওয়ার প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।