
পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ অভিযানের সময় অন্তত পাঁচটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছিল ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গকে প্রথম এই দাবি জানান। পরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জনসংযোগ বিভাগের (আইএসপিআর) মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী জানান, ভূপাতিত পাঁচ বিমানের মধ্যে তিনটি ছিল অত্যাধুনিক রাফাল, একটি সুখোই এবং একটি মিগ-২৯।
তবে ভারতের পক্ষ থেকে এ দাবির পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি মেলেনি। বিবিসি ভেরিফায়েড জানিয়েছিল, ভারতের পাঞ্জাবের একটি কৃষিজমিতে রাফাল যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায় এবং সেগুলো সরানোর কাজে সেনাসদস্যরা অংশ নেন।
ফ্রান্সের ডাসোঁ অ্যাভিয়েশনের তৈরি রাফালকে ভারতীয় বিমানবাহিনীর সবচেয়ে আধুনিক ও শক্তিশালী যুদ্ধবিমানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পাকিস্তান দাবি করেছিল, চীনে তৈরি ‘জে-১০ সি ই’ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে তারা ওই রাফাল ভূপাতিত করেছে।
এই জে-১০ সি ই যুদ্ধবিমানই এখন কিনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে বিমান কেনার চুক্তির খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে বলে সম্প্রতি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের যুদ্ধবিমান সম্পর্কের শুরু যেভাবে
চীন থেকে বাংলাদেশ প্রথম যুদ্ধবিমান কেনে ১৯৭৭ সালে। বিমানটির আনুষ্ঠানিক নাম ছিল এফ-৬। ঢাকার বিজয়স্মরণী থেকে জিয়া উদ্যানের দিকে যাওয়ার পথে সড়কের মোড়ে মাঝারি আকারের যে যুদ্ধবিমানটি দেখা যায়, সেটি এই ধরনেরই একটি বিমান। মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর বিমানটি উন্মুক্ত প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে।
এফ-৬ নামে পরিচিত হলেও চীনে এই বিমান জে-সিক্স নামে পরিচিত।
তবে বাংলাদেশের যুদ্ধবিমান বহরের শুরু হয়েছিল আরও কয়েক বছর আগে। ১৯৭৩-৭৪ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে বিনামূল্যে যুদ্ধবিমান উপহার দেয়। সেগুলো ছিল সে সময়ের অত্যাধুনিক সুপারসনিক মিগ-২১।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, এগুলো ছিল একেবারে ফ্যাক্টরি ফ্রেশ। কারখানা থেকে বের হয়েই আমরা পেয়েছিলাম। মানে রাশান বিমানবাহিনীর বাইরে আমরাই প্রথম পেয়েছিলাম। এমনকি ভারতও আমাদের কয়েকবছর পর মিগ-২১ পেয়েছিল। তখনকার এই অত্যাধুনিক বিমান আমাদের এগিয়ে দিয়েছিল অনেক।
তিনি বলেন, শুধু যুদ্ধবিমান নয়, এর সঙ্গে যত ধরনের মিসাইল, বোমা, রকেট- সব আমাদের দিয়েছিল। তখন থেকেই বিমানবহর শুরু হলো বলা যায়। তখন তো আমাদের কিছুই ছিল না। যুদ্ধের পর এয়াফিল্ডগুলো মেরামত হচ্ছিল। এমনকি ব্যাচের পর ব্যাচ প্রশিক্ষণের জন্য রাশিয়া পাঠানো হয়েছিল।
বর্তমানে বাংলাদেশের বিমানবাহিনীতে কী আছে?
মিগ-২১ দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের যুদ্ধবিমান সংগ্রহের প্রধান উৎস হিসেবে চীন গুরুত্ব পেতে থাকে। ১৯৭৭ সালে এফ-৬ কেনার পর আশির দশকে চীন থেকে এফ-৭ যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ।
এরপর ১৯৯৯ সালে বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। সে বছর রাশিয়া থেকে আটটি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান কেনে বাংলাদেশ। তখন এগুলো বিশ্বের অন্যতম সেরা আকাশ প্রতিরক্ষা ফাইটার জেট হিসেবে বিবেচিত ছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর বহর অনেকটাই পুরোনো হয়ে পড়েছে। বহরের একটি অংশ ইতোমধ্যে অচল হয়ে গেছে, আর অন্য অংশটিও পুরোনো হয়ে অচল হওয়ার পথে।
বাংলাদেশ সরকারিভাবে বিমানবাহিনীর সরঞ্জাম ও যুদ্ধবিমানের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না। তবে সামরিক তথ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘ওয়ারপাওয়ার বাংলাদেশ’-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বহরে মোট ২১২টি বিমান রয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধবিমান ৪৪টি।
এই ৪৪টি যুদ্ধবিমানের মধ্যে আটটি রাশিয়ার মিগ-২৯ এবং ৩৬টি চীনের তৈরি এফ-৭। এসব মডেল তুলনামূলকভাবে পুরোনো।
বিমানবাহিনীতে আরও রয়েছে ১৪টি ইয়াক-১৩০। এগুলো মূলত প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হলেও হালকা আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা রয়েছে। রাশিয়া থেকে এসব বিমান সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী।
এ ছাড়া চীনের এফটি-৭ প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের লকহিডের দুটি সিরিজের কৌশলগত পরিবহন বিমানও বাংলাদেশের বিমানবাহিনীতে রয়েছে।
ওয়ারপাওয়ার বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, বিমানবাহিনীর বহরে হেলিকপ্টার রয়েছে ৭৩টি। এর মধ্যে রাশিয়ার এমআই সিরিজের হেলিকপ্টার ৩৬টি।
যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি সেসনা ও বেলের বিভিন্ন মডেলের হেলিকপ্টার রয়েছে ২৪টি। পাশাপাশি ফ্রান্স, ইতালি এবং চেকোস্লোভাকিয়া (চেক রিপাবলিক) থেকে সংগ্রহ করা কিছু প্রশিক্ষণ বিমান ও হেলিকপ্টারও বাংলাদেশ ব্যবহার করছে।
বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর কাছে ৪৪টি ড্রোন রয়েছে বলেও জানিয়েছে ওয়েবসাইটটি। এর মধ্যে ৩৬টি স্লোভেনিয়ায় তৈরি ব্রামর সি-৪ আই। তুরস্কের তৈরি বায়রাক্তার টিবি-২ রয়েছে ছয়টি। গত বছরই এসব ড্রোন বাংলাদেশের বহরে যুক্ত হয়।
পুরোনো বহরের জায়গায় নতুন যুদ্ধবিমান
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক এয়ার ভাইস মার্শাল এম আবুল বাশার বলেন, বাংলাদেশের মিগ-২৯ কিছুটা আধুনিক হলেও বর্তমান সময়ের বিবেচনায় সেটিও পুরোনো। এর বাইরে বিমানবাহিনীর বাকি যুদ্ধবিমানগুলো আরও পুরোনো থ্রি-জি প্রযুক্তির।
তার ভাষায়, বর্তমানে যে ধরনের যুদ্ধ চলছে সেখানে ফোর পয়েন্ট ফাইভ-জি, এমনকি ফাইভ-জি প্রযুক্তির স্টেলথ বিমানও ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের বিমানবাহিনীকে আধুনিক করার কোনো বিকল্প ছিল না। এখন চীন থেকে যেসব বিমান আনা হচ্ছে, সেগুলো আধুনিক ফোর পয়েন্ট ফাইভ-জি প্রযুক্তির।
জে-১০সি ই কী ধরনের যুদ্ধবিমান?
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চীন থেকে ২০টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলো মাল্টিরোল ফাইটার জেট হিসেবে পরিচিত।
অর্থাৎ একই যুদ্ধবিমান বিভিন্ন ধরনের সামরিক অভিযানে ব্যবহার করা সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে—
এয়ার-টু-এয়ার সাপোর্ট: আকাশসীমায় শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান প্রতিহত করার কাজে ব্যবহার করা যায়।
এয়ার-টু-গ্রাউন্ড: শত্রুপক্ষের ভূখণ্ডে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে।
ক্লোজ এয়ার সাপোর্ট: স্থলযুদ্ধে থাকা সেনাদের বিমান থেকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব।
মেরিটাইম এয়ার সাপোর্ট: সমুদ্রে অবস্থানরত নৌবাহিনীকে আকাশপথে সহায়তা করা যায়।
সাবেক এয়ার ভাইস মার্শাল এম আবুল বাশার বলেন, এই একটি বিমানই সব ধরনের কাজ করতে সক্ষম।
তবে তাঁর মতে, আধুনিক যুদ্ধের জন্য শুধু যুদ্ধবিমান থাকাই যথেষ্ট নয়। রাডার, জ্যামিং প্রযুক্তি এবং মিসাইলের কার্যকর ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বিমান, নৌ ও স্থলবাহিনীর অস্ত্র ও সরঞ্জামের মধ্যে ‘রিয়েল টাইম’ সমন্বয়ও যুদ্ধের সাফল্যের অন্যতম শর্ত।
কেন চীনের ওপর এতটা নির্ভরতা?
বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর বহুমাত্রিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে চাইছে। কিন্তু সেই আধুনিকায়নের বড় অংশেই চীনের তৈরি সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা দেখা যাচ্ছে।
নৌবাহিনীর সাবমেরিন, রণতরী থেকে শুরু করে সেনাবাহিনীর ট্যাংক, সাঁজোয়া যান এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় একটি অংশ চীন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে বর্তমানে দুটি সাবমেরিন রয়েছে। দুটিই চীনের তৈরি এবং ২০১৭ সালে সেগুলো নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়।
এ ছাড়া গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে মোট ১১৭টি নৌযান রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি ফ্রিগেট বা রণতরী।
এর পাশাপাশি রয়েছে ছয়টি কর্ভেট যুদ্ধজাহাজ। এসব কর্ভেটের চারটি চীনে তৈরি এবং দুটি যুক্তরাজ্যের।
বাংলাদেশের ফ্রিগেটগুলোর মধ্যে চারটি চীনের তৈরি, দুটি যুক্তরাষ্ট্রের এবং একটি দক্ষিণ কোরিয়ার তৈরি।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির প্রধান উৎস হিসেবে চীন কীভাবে এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল?