
পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় পর্যায়ে কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের পরিবর্তে ৪৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে হেলেন জেরিন খানের উত্থাপিত নোটিশের জবাব দিতে গিয়ে বিদ্যুৎ খাত নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। এ সময়ই তিনি রামপালের দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প পরিবর্তনের তথ্য জানান।
রামপালে কয়লার পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ
প্রতিমন্ত্রী বলেন, পরিবেশ ও ঐতিহ্য রক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় পর্যায়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প না করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্প থেকে ৪৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকবে।
শুধু রামপাল নয়, মাতারবাড়ী কোল পাওয়ার প্রকল্পের অব্যবহৃত অ্যাশ পন্ড এলাকাতেও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সেখানে ৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
২০৩০ সালে বিদ্যুতের চাহিদা হতে পারে ২৫ হাজার মেগাওয়াট
সংসদে দেশের বিদ্যুতের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ চাহিদা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিকল্পনা তুলে ধরে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের বর্তমান গতি অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ২৪ থেকে ২৫ হাজার মেগাওয়াটে দাঁড়াতে পারে।
এই বাড়তি চাহিদা মেটাতে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
২০৩০ সালে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে
সরকারের জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০৪০ সালের মধ্যে এই হার ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রাও রাখা হয়েছে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এর বাইরে বায়ু, বর্জ্য, পানি, ভাসমান সোলার এবং এগ্রি-ভোল্টাইকসের মতো অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগের কথাও সংসদে তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি এবং প্রয়োজনীয় কাঠামো আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে আগামী ছয় মাস সম্পূর্ণ করছাড়ের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
আগামী ছয় মাসের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগকারীরা যে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করবেন, তা সরকার কিনে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করবে বলেও জানান অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
প্রতি ইউনিট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে কেনার কথা জানিয়েছে সরকার।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পিপিপি প্রকল্প
সরকারি জমি ব্যবহার করে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ‘সরকারি জমিতে প্রকল্প উন্নয়ন নির্দেশিকা ২০২৬’ জারি করা হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
এ ছাড়া বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ‘বেসরকারি অংশগ্রহণ বৃদ্ধি নীতিমালা ২০২৫’ জারি করা হয়েছে বলেও তিনি সংসদে জানান।
নেট মিটারিং ও রুফটপ সোলার কর্মসূচি চূড়ান্ত
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, নেট মিটারিং গাইডলাইন, জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবসায়িক মডেল চূড়ান্ত করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি হুইলিং চার্জ ও ক্রস-সাবসিডি চার্জ নিয়ে যেসব বিষয় রয়েছে, সেগুলোও দ্রুত সমাধানের জন্য কাজ চলছে বলে সংসদকে জানান তিনি।