
প্রথমবারের মতো অপরাধের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করার সুস্পষ্ট আইনি ক্ষমতা পেল আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সংসদে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬’ পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে বাহিনীটির দায়িত্ব ও কার্যক্রমের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ল।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে কণ্ঠভোটে বিলটি সংসদে পাস হয়।
১৯৭৯ সালের অধ্যাদেশ বাতিল, নতুন আইনি কাঠামো
নতুন আইন কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে ১৯৭৯ সালের পুরোনো ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অধ্যাদেশ’ বাতিল করে তার পরিবর্তে বাংলায় একটি আধুনিক আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। নতুন আইনে আগের র্যাব-সংক্রান্ত বিধানও বাদ দেওয়া হয়েছে।
এই আইনের আওতায় স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রোটেকশন ব্যাটালিয়ন, মাউন্টেন ব্যাটালিয়ন ও এয়ারপোর্ট ব্যাটালিয়নের মতো বিশেষায়িত ইউনিটগুলো এপিবিএনের একক কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হবে।
গুরুতর অপরাধে সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারবে
এতদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বের পাশাপাশি নতুন আইনে এপিবিএনের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। এখন থেকে সন্ত্রাসবাদ, মাদক পাচার, মানব পাচার, ধর্ষণ, অপহরণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাইবার অপরাধ, গুম এবং জমি দখলের মতো গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধে বাহিনীটি সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারবে।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রের নির্ধারিত ভিআইপিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও এপিবিএনের ওপর থাকবে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষাও বাহিনীটির দায়িত্বের মধ্যে রাখা হয়েছে।
তদন্ত করবেন অন্তত সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তা
এপিবিএনের কর্মকর্তাদের ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার বিধান নতুন আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। প্রথমবারের মতো এই আইনের মাধ্যমে বাহিনীটির কর্মকর্তারা সরাসরি অপরাধ তদন্ত করতে পারবেন।
অপরাধ কার্যবিধি, ১৮৯৮ এবং পুলিশ রেগুলেশনস, ১৯৪৩ অনুসরণ করে ন্যূনতম সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তারা এসব তদন্ত পরিচালনা করবেন।
তদন্তের প্রয়োজনে এপিবিএনকে নিজস্ব ডিটেনশন সেল বা আটক কেন্দ্র, ব্যারাক এবং জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের আইনি অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের নেতৃত্বে বাহিনী
নতুন কাঠামো অনুযায়ী পুরো এপিবিএন একজন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের নেতৃত্বে পরিচালিত হবে। তবে বাহিনীটি পুলিশের মহাপরিদর্শকের সার্বিক তদারকির আওতায় থাকবে।
এ ছাড়া বাহিনীর উদ্ভাবন ও কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এপিবিএন সদর দপ্তরে একটি সাইবার সেল এবং গবেষণা ইউনিট প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে।
বাইরের বিশেষজ্ঞদেরও যুক্ত করা যাবে
অপারেশনাল প্রয়োজন বিবেচনায় পুলিশ বাহিনীর বাইরে থেকেও পেশাদার বিশেষজ্ঞদের এপিবিএনে যুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে নতুন আইনে।
এর ফলে আইনজীবী, মনোবিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও বিচারকদের চুক্তির ভিত্তিতে অথবা প্রাক্কলনে (ডেপুটেশন) এপিবিএনে নিয়োগ দেওয়া যাবে। তবে বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর প্রত্যেক সদস্যের জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বদলেছে এপিবিএনের বিচারিক কাঠামো
নতুন আইনে বাহিনীর বিচারিক ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। পুরোনো অধ্যাদেশের অধীনে থাকা পুলিশ-প্রধান আদালত ব্যবস্থার পরিবর্তে এপিবিএনের বিশেষ ও আপিল আদালতে অসামরিক বিচার বিভাগের সদস্যদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, সংক্ষিপ্ত এপিবিএন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট আপিল আদালতে আবেদন করা যাবে। আর বিশেষ এপিবিএন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য সময় পাওয়া যাবে ৩০ কার্যদিবস।
নতুন এই আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে এপিবিএনের অপরাধ তদন্ত, নিরাপত্তা কার্যক্রম, বিশেষায়িত ইউনিট পরিচালনা এবং বিচারিক ব্যবস্থার দায়িত্ব ও পরিধিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হলো।