
সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ আগামীকালের মধ্যে আগের অবস্থায় ফিরবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অস্থিতিশীলতা না করে সরকারকে তাদের মেয়াদে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ দেয়া উচিত।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ব্যবসায়ী নেতা ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তিন ঘণ্টাব্যাপী মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি। সভায় অংশ নেওয়া ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিরাও বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।
সভায় ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পথরেখা’ শীর্ষক একটি উপস্থাপনা দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকার নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে কাজ করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তার ভাষ্য, পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও এর সুফল পাবে।
দেশের বর্তমান গ্যাস সংকটের পেছনে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। দুর্ঘটনার কারণে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে এবং এর প্রভাব শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন খাতে পড়ে। তবে দুর্ঘটনাজনিত সমস্যার সমাধান ইতোমধ্যে হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আশা করছি, ইনশাআল্লাহ, আগামীকাল সন্ধ্যা থেকে গ্যাসের সরবরাহ এক-দেড় মাস আগে যে অবস্থায় ছিল, সে রকম একটা অবস্থায় ফিরে আসবে।’
গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় তৃতীয় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। জিটুজি ভিত্তিতে গত এক মাসে নতুন টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তুতি অনেকটাই সম্পন্ন হয়েছে। দ্রুতই এর কাজ শুরু হবে বলে জানান সরকারপ্রধান।
২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তৃতীয় টার্মিনালকে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ খাতের সংকটও দীর্ঘদিনের। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এখন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘যেকোনো কিছু পরিকল্পনা করা এবং সেটি বাস্তবায়ন করতে সময় লাগে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের এই সমস্যা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। চাইলেই ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে এর সমাধান করা সম্ভব নয়।’
সরকার কোন কাজ কখন শেষ করতে চায়, মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে তার একটি সম্ভাব্য সময়সীমাও তুলে ধরা হয়। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময় কিছুটা কম-বেশি হতে পারে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, সরকারের সামনে এখন একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও সময়সীমা রয়েছে।
ব্যবসা ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে উল্লেখ করে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যার সমাধান শুধু ব্যবসায়ীদের স্বার্থের বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি জড়িত।
২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য অর্জন করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি বলেও জানান তিনি। এ লক্ষ্য সামনে রেখেই সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সংকটের ব্যাপ্তি ও জটিলতা সম্পর্কে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আগে থেকেই অবগত। সরকার কোনো সমস্যা আড়াল না করে সেগুলো খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছে এবং সমাধানের পরিকল্পনাও জানিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এতটুকু আমরা আপনাদের জানাতে চেয়েছি যে আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। সে জন্য হতাশ হওয়ার মতো কারণ নেই।’
সরকারের পরিকল্পনা যৌক্তিক মনে হলে তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের পাশাপাশি পুরো দেশই উপকৃত হবে।
দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী। জনগণ সময়মতো কাকে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেবে, সেটি জনগণই নির্ধারণ করবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে যে সময় যে সরকার দায়িত্বে থাকবে, তাকে পরিকল্পিত কাজগুলো শেষ করার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
মতবিনিময় সভায় গণমাধ্যমকর্মী ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের আমন্ত্রণ জানানোর কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা গণমাধ্যমের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। তা না হলে বিচ্ছিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
গণমাধ্যম সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেলে তা দেশবাসীর কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বড় কোনো কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করতে হলে কার্যকর একটি দল প্রয়োজন। সরকারের সংশ্লিষ্ট সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করছেন, যাতে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়।
ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমাদের সহযোগিতা করবেন, যাতে আমরা আপনাদের জন্য আরও ভালো কিছু করতে পারি।’
সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা মাহদী আমিন, ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ ও জ্বালানি সচিব মো. জিয়াউল হক উপস্থিত ছিলেন।
ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক, বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ড্রাষ্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ, বাংলাদেশ জুট মিলস এসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল কামাল, চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাষ্ট্রিজের সভাপতি আমিরুল হক এবং বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসরস এসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব আনাম প্রমুখ।
এ ছাড়া দৈনিক মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ড. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, ইংরেজি দৈনিক ওয়াদা’র সম্পাদক শফিকুল আলম, সাংবাদিক আশরাফ কায়সার, মোস্তাফা ফিরোজ, আব্দুন নূর তুষার, আকবর হোসেন, শাহেদ আলম, রেজাউল করিম রনি, আজিজুর রহমান রিপন, তরিকুল ইসলাম সৌরভ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহরিন ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।