
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই রেল করিডোরে ডিজেল-ইলেকট্রিক ট্র্যাকশনের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালু করতে ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বর্তমানে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
‘বাংলাদেশ রেলওয়ের নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন বাস্তবায়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ৫২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার রেলপথে ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা নির্মাণ করা হবে। এর মাধ্যমে রেললাইনের ওপর থেকে ট্রেনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। পাশাপাশি পাঁচ কোচের ১৬ সেট বৈদ্যুতিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) সংগ্রহ করা হবে। অর্থাৎ মোট ৮০টি কোচ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। ইএমইউর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্মাণ করা হবে একটি পৃথক মেরামত কারখানা।
বড় অংশ বৈদেশিক ঋণ
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ৯৪২ কোটি ৯ লাখ টাকা। বাকি ২ হাজার ৮৮০ কোটি ৪২ লাখ টাকা প্রকল্প ঋণ হিসেবে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক থেকে এ ঋণ নেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ২৮২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। পরে প্রকল্পটি পুনর্গঠন করে ব্যয় ৪৬০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বা ১২ দশমিক ০৪ শতাংশ কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাস্তবায়নকাল ১০ বছর থেকে কমিয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে।
ব্যস্ত করিডোরে সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য
পরিকল্পনা কমিশনের মতে, নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ রেল করিডোর। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী এই পথে চলাচল করেন। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে রয়েছে বিপুলসংখ্যক শিল্পকারখানা। ফলে এসব এলাকার সড়ক ও রেলপথে পরিবহনের চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
সরকারের প্রত্যাশা, বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালু হলে ট্রেনের গড় গতি বাড়বে এবং প্রতি ট্রেনের যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এতে কম সময়ে বেশি যাত্রী পরিবহন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ট্রেন পরিচালনা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমবে।
প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, প্রচলিত ডিজেল-ইলেকট্রিক ট্র্যাকশনের তুলনায় বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন প্রায় ৪০ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয়ী হতে পারে। বৈদ্যুতিক রোলিং স্টকের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কম হতে পারে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক ট্রেন দ্রুত গতি বাড়াতে ও কমাতে সক্ষম হওয়ায় গড় গতিবেগ প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ বেশি হতে পারে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবেশের জন্যও সুবিধা
বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালু হলে কার্বন নিঃসরণ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য রেল যোগাযোগে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রকল্পের আওতাভুক্ত এলাকা হিসেবে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরকে নির্ধারণ করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সদর, ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন এবং গাজীপুর সদর এলাকায় প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়ন হবে।
পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ ব্যয় ২০২৮-২৯ অর্থবছরে
প্রকল্পের আওতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬১ কোটি ৬০ লাখ, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৪৫৯ কোটি ৭৮ লাখ, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ১ হাজার ৮৪৮ কোটি ৬৮ লাখ, ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ১ হাজার ১০৩ কোটি ৫২ লাখ এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৩৪৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করেছে তুরস্কের টুমাস তুর্কিশ ইঞ্জিনিয়ারিং কনসাল্টিং অ্যান্ড কন্ট্রাক্টিং কোম্পানি। ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন শর্ত প্রতিপালনের ভিত্তিতে সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়। এরপর সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে একনেকের অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হয়।
রেলওয়ে ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যুৎচালিত এই রেলপথে দুই প্রান্ত থেকে প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর ট্রেন ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিদিন দুই লাখ যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ইএমইউ ট্রেনের বৈশিষ্ট্য অনেকটা মেট্রোরেলের ট্রেনের মতো।
বড় প্রকল্পে জবাবদিহিতার প্রশ্ন
অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, মানসম্মত কাজের মাধ্যমে প্রকল্পটি সফলভাবে শেষ করতে হবে। একই সঙ্গে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন, যাতে কোনো ধরনের অপচয় না হয়।
তিনি বলেন, প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত চীনা ঠিকাদাররা কেন ২০২২ সালে কাজ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, সেটি খুঁজে বের করা দরকার। তদন্তের মাধ্যমে যারা এর জন্য দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দুর্বলতা। শুরুতেই যথাযথ সমীক্ষা ও পরিকল্পনা না থাকায় পরবর্তী সময়ে সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয়, মেয়াদ ও বিভিন্ন উপাদানে পরিবর্তন আনতে হয়েছে। এতে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি জবাবদিহিতার প্রশ্নও তৈরি হয়েছে।
সরকার নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বৈদ্যুতিক রেল চালুর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়। সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের যাত্রী পরিবহনে রেলের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি দ্রুত, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থার নতুন সুযোগ তৈরি হবে।