
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়াকে ‘দেশ বিক্রি’ বলে আখ্যা দেওয়ার সমালোচনা করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তাঁর মতে, এ ধরনের মন্তব্য অমূলক ও সস্তা। টার্মিনালের জমির মালিকানা বাংলাদেশের কাছেই থাকছে; নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কেবল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে সরকার চাইলে তা নবায়ন করতে পারবে, অন্যথায় এর অবসান ঘটবে।
শুক্রবার দুপুরে সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভা ও অনুদান বিতরণ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
‘মালিকানা বাংলাদেশের, বিদেশি প্রতিষ্ঠান শুধু পরিচালনা করবে’
চট্টগ্রাম বন্দরের বৃহত্তম টার্মিনাল এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার বিষয়ে চলমান সমালোচনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘দেশ বিক্রি’ করার অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তাঁর ব্যাখ্যা, টার্মিনালের জমির মালিকানা বাংলাদেশ সরকারের হাতেই থাকবে; বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে শুধু নির্ধারিত সময়ের জন্য পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিষয়টি বোঝাতে তিনি সিলেট সিটি করপোরেশনের ভবনের উদাহরণ টেনে বলেন, কোনো ভবনের একটি তলা ভাড়া দেওয়া হলে যেমন পুরো ভবন বিক্রি হয়ে যায় না, তেমনি টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তর করলেই দেশের সম্পদের মালিকানা চলে যায় না। চুক্তির মেয়াদ শেষে সরকার নবায়ন কিংবা চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
লজিস্টিক ব্যয় কমিয়ে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বাড়ানোর লক্ষ্য
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বিদেশি ও দেশীয় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে উৎপাদন, রপ্তানি এবং পণ্য বাজারজাতকরণের ব্যয় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পর্যায়ে আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের লজিস্টিক ব্যয় বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করছে।
তিনি জানান, বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৬ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ লজিস্টিক খাতে ব্যয় হয়। বিপরীতে বৈশ্বিক গড় এ হার ১০ শতাংশ। উন্নত দেশগুলোতে তা আরও কম, প্রায় ৬ থেকে ৮ শতাংশ। ব্যয় কমিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জন করা না গেলে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ পাওয়া কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালন দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, কনটেইনার দ্রুত ওঠানো-নামানো সম্ভব হলে বন্দরে জাহাজের অপেক্ষার সময় কমবে। এর ফলে আমদানি পণ্যের এককপ্রতি ব্যয় এবং জাহাজভাড়া বা ফ্রেইট চার্জ কমতে পারে। শেষ পর্যন্ত এর সুফল দেশের সাধারণ ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কর্মীদের চাকরি হারানোর শঙ্কা নেই
এনসিটি পরিচালনার চুক্তির কারণে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না, এমন উদ্বেগের জবাবে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, চুক্তি অনুমোদনের আগে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে শ্রমিকদের স্বার্থ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কমিটির সভাপতি ও অর্থমন্ত্রী চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য হওয়ায় তিনিও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।
তিনি দাবি করেন, কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েই চুক্তিটি অনুমোদন করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এ চুক্তির কারণে বন্দরের কোনো কর্মী চাকরি হারাবেন না। বরং বন্দরের কার্যক্রম ও সক্ষমতা বাড়লে ভবিষ্যতে কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা এবং পারিশ্রমিক বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে।
দুর্গাপূজার ৮৫ মণ্ডপে ৩৪ লাখ টাকা অনুদান
এর আগে শুক্রবার সকালে এক দিনের সফরে সিলেটে পৌঁছে নগর ভবনের সভাকক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভা ও অনুদান বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে সিলেট নগরীর ৮৫টি দুর্গাপূজা মণ্ডপের প্রতিনিধিদের হাতে ৪০ হাজার টাকা করে মোট ৩৪ লাখ টাকার অনুদানের চেক তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম বিপিএম, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন, সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, রামকৃষ্ণ মিশন ও আশ্রমের অধ্যক্ষ স্বামী চন্দ্রনাথানন্দ মহারাজ, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি সুদীপ রঞ্জন সেন এবং বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মৃত্যুঞ্জয় ধর ভোলা।