
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়া এবং জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বেইজিং। অন্যদিকে ঋণ ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে ওয়াশিংটন।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তা এবং চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের (এক্সিম ব্যাংক) প্রতিনিধিরা। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) বৈঠক সম্পর্কে অবগত একাধিক কর্মকর্তা এসব তথ্য জানিয়েছেন।
জ্বালানি খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ চীনের
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের এক সদস্য জানান, ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আগামী সপ্তাহে ঢাকা সফর করবেন বলে বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে। সফরকালে দুই পক্ষের মধ্যে সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, চীনের এক্সিম ব্যাংক এবং দেশটির সহযোগিতাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ও যৌথ বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বিনিয়োগনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যেতে পারবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ঋণ ব্যবস্থাপনায় সহায়তার আশ্বাস যুক্তরাষ্ট্রের
বাংলাদেশের ঋণ ব্যবস্থাপনাসহ অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ। একই সঙ্গে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের উন্নতি এবং দেশটি থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের আরও বেশি সহায়তা পাওয়া উচিত।
তিনি জানান, অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাংলাদেশ প্রত্যাশিত মাত্রায় সহায়তা পায়নি। তবে বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ কেনার পাশাপাশি তেল, সয়াবিনসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশকে বাড়তি সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।
অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে ঋণ ব্যবস্থাপনা, মার্কিন সহায়তা এবং দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
আইএমএফের অর্থায়নে ওয়াশিংটনের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতাকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ওয়াশিংটনের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। ফলে সংস্থাটি থেকে অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন বাংলাদেশের জন্য সহায়ক হতে পারে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়েছে—এ বাস্তবতা আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা স্বীকার করেছে।
তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। তারপরও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধানে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মনে করছে। এ কারণে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও মার্কিন ট্রেজারি বিভাগসহ বিভিন্ন পক্ষ বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে।
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের মতে, দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলোকে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মার্কিন কর্মকর্তারা ইতিবাচকভাবে দেখেছেন।
সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে আলোচনার ভিত্তিতে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে আশা করছে সরকার। অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা, ঋণ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার বিষয়গুলোতে এ সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।