
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে তাঁর বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া তথ্যে বেশ কিছু অসংগতি পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। বিশেষ করে তুরাগ নদ-সংলগ্ন মাজার বস্তি মাঠে যাওয়ার কারণ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে দীপ বারবার বক্তব্য পরিবর্তন করছেন। ওই রাতে তাঁদের সঙ্গে কোনো নারী কিংবা অন্য কেউ ছিলেন কি না, সে বিষয়েও স্পষ্ট কোনো তথ্য দিচ্ছেন না তিনি।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, তাহসিফ ও দীপ কেন ওই মাঠে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সময় দীপের বক্তব্যে মিল পাওয়া যাচ্ছে না। কখনো এক ধরনের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, আবার কিছুক্ষণ পরই বলছেন অন্য কথা। তাঁদের সঙ্গে আরও কেউ ছিলেন কি না, সে বিষয়েও পরিষ্কার উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
তাহসিফের মৃত্যুর পেছনে মাদক ও নারী সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনা সামনে রেখে তদন্ত চালাচ্ছে পিবিআই। পাশাপাশি এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, নাকি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু, তা-ও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীপের কাছ থেকে পাওয়া কোনো বক্তব্যই সরাসরি গ্রহণ করা হচ্ছে না। প্রতিটি তথ্যের সত্যতা আলাদাভাবে যাচাই করা হচ্ছে। এ ছাড়া তাহসিফের মুঠোফোনের কলতালিকা, হোয়াটসঅ্যাপের কথোপকথন ও বার্তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
মাঠে যাওয়া নিয়ে দীপের বক্তব্যে অসঙ্গতি
পিবিআই সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদের শুরুতে তদন্তকারীরা দীপের কাছে জানতে চান, তাঁরা তুরাগ নদ-সংলগ্ন মাজার বস্তি মাঠে কী কারণে গিয়েছিলেন। জবাবে দীপ একেকবার একেক ধরনের তথ্য দেন। একপর্যায়ে তিনি দাবি করেন, ওই মাঠে তিনি যাননি। বরং তাহসিফ তাঁকে জানিয়েছিলেন যে তিনি সেখানে যাবেন।
তখন তদন্তকারীরা তাঁকে পাল্টা প্রশ্ন করেন, তিনি যদি মাঠে না গিয়ে থাকেন, তাহলে সেখানে তাঁদের মোটরসাইকেলটি কোথায় রাখা হয়েছিল, সেটি কীভাবে জানলেন?
এ প্রশ্নের পর নিজের আগের বক্তব্য থেকে সরে আসেন দীপ। এবার তিনি জানান, তাহসিফই তাঁকে মোটরসাইকেলে করে ওই মাঠে নিয়ে গিয়েছিলেন। এর আগে জায়গাটি সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে সেখানে যাওয়ার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে এখনো নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি দীপ। তাঁদের সঙ্গে কোনো নারী কিংবা অন্য কেউ ছিলেন কি না, সে বিষয়েও একই ধরনের অস্পষ্ট বক্তব্য দিচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দীপের বক্তব্যের এই পরিবর্তন তদন্তের ক্ষেত্রে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। তবে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি বেশ স্বাভাবিক ও শান্ত থাকছেন এবং নিজের মতো করে প্রতিটি প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নেওয়া পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা জানান, টঙ্গীর মাজার বস্তিসংলগ্ন মাঠটি মাদক সেবনের স্থান হিসেবে পরিচিত। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগেও একাধিকবার অভিযান চালিয়েছে।
তদন্তে পাওয়া কিছু তথ্যের ভিত্তিতে তাহসিফ ও দীপের ওই এলাকায় যাওয়ার সঙ্গে মাদকের কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন কর্মকর্তারা। ওই রাতে তাঁদের সঙ্গে অন্য কেউ ছিলেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, মাদক গ্রহণের উদ্দেশ্যেই যদি তাঁরা সেখানে গিয়ে থাকেন, তাহলে ঢাকা থেকে বের হয়ে টঙ্গীর ওই নির্দিষ্ট মাঠে যাওয়ার প্রয়োজন কেন হয়েছিল, তা দীপের কাছে বারবার জানতে চাওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই তাঁর কাছ থেকে ভিন্ন ধরনের উত্তর পাওয়া যাচ্ছে। এসব বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নেওয়া আরেক কর্মকর্তা জানান, তাহসিফের সঙ্গে ঘটনার রাতে একজন নারী ছিলেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁকে নিয়ে তাহসিফ কয়েকটি জায়গায় গিয়েছিলেন। তবে ওই নারী শেষ পর্যন্ত মাজার বস্তির মাঠে গিয়েছিলেন, নাকি সেখানে যাওয়ার আগেই তাহসিফ তাঁকে বাসায় পৌঁছে দিয়েছিলেন, তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, মাদকের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। কারণ, তাহসিফের মাদক সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনা নির্দেশ করে এমন কিছু তথ্য তদন্তকারীদের হাতে এসেছে।
ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপের যোগাযোগ বিশ্লেষণ
গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর নিজ বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। এরপর রাতে তিনি কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, তা প্রযুক্তিগত তথ্যের সাহায্যে বের করার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।
এ জন্য তাঁর মুঠোফোনের সাধারণ কলতালিকার পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপের কল ও বার্তার তথ্যও সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব তথ্য ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফ ও দীপের মধ্যে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত মুঠোফোন এবং হোয়াটসঅ্যাপে ১০ থেকে ১২ বার যোগাযোগ হয়েছিল। এসব কথোপকথনের কয়েকটির স্থায়িত্ব ছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ড। আবার কোনো কোনো কল কয়েক মিনিট পর্যন্ত চলেছে।
একই রাতে তাহসিফের কাছে অন্য একাধিক নম্বর থেকেও কল এসেছিল। তিনিও বিভিন্ন নম্বরে যোগাযোগ করেছিলেন। এসব নম্বর ও কথোপকথনের সময়সহ যাবতীয় তথ্য পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় এখনো মামলা না হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিহতের পরিবার মামলা না করলে পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা করবে।
তিনি বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা করা হলে তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চালানো হবে। পাশাপাশি পরিবার কেন এখনো মামলা করেনি, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। পরবর্তী সময়ে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসে কি না, তা-ও পর্যবেক্ষণে রাখা হবে।
জানাজা ও দাফনে যাননি দীপের পরিবারের কেউ
শুক্রবার রাতে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের কার্যালয়ে দীপের বাবা, ছোট ভাই ও মামাকে দেখা যায়। এ সময় দীপের বাবা ছেলের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে তাঁর মামা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পড়াশোনার সূত্র ধরে তাহসিফ ও দীপের পরিচয় হয়েছিল। সেই পরিচয় থেকেই তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তাহসিফ মোহাম্মদপুরে দীপের বাসায় যাতায়াত করতেন। সেখানে দীপের ভাইসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গেও তাঁর পরিচিতি তৈরি হয়েছিল।
তাহসিফের জানাজা ও দাফনে দীপ কিংবা তাঁর পরিবারের কেউ উপস্থিত ছিলেন কি না, জানতে চাইলে দীপের মামা জানান, তাঁদের কেউই সেখানে যাননি।
তাহসিফের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং দুই পরিবারের পরিচয় থাকার পরও দীপ বা তাঁর পরিবারের সদস্যরা জানাজা ও দাফনে অংশ নেননি কেন, এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
সব তথ্য যাচাইয়ের পর সিদ্ধান্ত
তাহসিফের মৃত্যুর সামগ্রিক তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, ঘটনাটির পেছনে একাধিক সম্ভাবনা ধরে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। এর মধ্যে মাদক ও নারী সংশ্লিষ্টতার বিষয় রয়েছে। পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, নাকি দুর্ঘটনা, তা নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার রহস্য নিশ্চিতভাবে উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্যের মধ্যে মিল-অমিল পরীক্ষা করা হচ্ছে। দীপ জিজ্ঞাসাবাদে যা বলছেন, সেগুলোর সবকিছুই সত্য ধরে নেওয়া হচ্ছে না। প্রতিটি বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ খোঁজা হচ্ছে।
ময়না তদন্তে জানা যাবে মৃত্যুর কারণ
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের সময় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পরীক্ষার জন্য তাঁর পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে রক্ত ও ভিসেরার নমুনাও পরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হয়েছে।
ফরেনসিক বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, উদ্ধারের সময় মরদেহটি আনুমানিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে পানিতে ডুবে মৃত্যুর বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, তাহসিফ বিমানবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন এবং একজন পাইলট হিসেবে তাঁর সাঁতার জানার কথা। সে ক্ষেত্রে কী পরিস্থিতিতে তিনি পানিতে পড়েছিলেন এবং তখন তাঁর সাঁতরে আত্মরক্ষার সক্ষমতা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের ফলাফল পাওয়ার পর এ বিষয়ে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।
পাকস্থলী, কিডনি ও রক্তের নমুনা পরীক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ওই কর্মকর্তা বলেন, মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো শারীরিক বা রাসায়নিক কারণ ছিল কি না, তা জানতেই এসব পরীক্ষা করা হচ্ছে। তাহসিফ মাদক কিংবা অন্য কোনো নেশাজাতীয় পদার্থ গ্রহণ করে থাকলে পরীক্ষায় সে বিষয়েও তথ্য পাওয়া যেতে পারে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার কথা রয়েছে।
পুলিশের ধাওয়ার দাবি দীপের, চলছে তদন্ত
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসার পর তাঁর বন্ধু দীপ নতুন একটি তথ্য দেন। তাঁর দাবি, তাঁরা যে স্থানে ছিলেন, সেখানে পুলিশের মতো দেখতে দুজন ব্যক্তিকে দেখে দুজনই দৌড় দেন। তবে ওই ব্যক্তিরা প্রকৃতপক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ছিলেন কি না, তা নিয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে পিবিআই।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার রাতে তাঁর সঙ্গে দীপও ছিলেন। দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সেগুলোর সত্যতা যাচাই না করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চান না তদন্তকারীরা।
দীপের বক্তব্য তুলে ধরে এনায়েত হোসেন জানান, ঘটনাস্থলে পুলিশের মতো দুজন ব্যক্তিকে দেখে তাঁরা দৌড়ে পালিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন দীপ। এখন ওই ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। তাঁরা সত্যিই পুলিশের সদস্য ছিলেন কি না, তাঁদের গায়ে পুলিশের পোশাক ছিল কি না কিংবা ওই এলাকায় কোনো দায়িত্ব পালন করছিলেন কি না—সব দিক খতিয়ে দেখা হবে।
পিবিআইয়ের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, এর আগে দীপ তদন্তকারীদের জানিয়েছিলেন, রাত ১২টার দিকে হাউস বিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়। এরপর দুজন আলাদা পথে চলে যান এবং তাঁদের মধ্যে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। কিন্তু ওই বক্তব্যের সঙ্গে পরবর্তী তথ্যের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে রাত ২টার দিকে তাঁরা আবার কেন ওই এলাকায় গেলেন এবং গভীর রাতে মোটরসাইকেল নিয়ে সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল, তা পরিষ্কার করার চেষ্টা চলছে।
দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি কালো রঙের সুজুকি জিক্সার ১৫০ মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটির সঙ্গে তাহসিফের মৃত্যুর সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এর মালিকানা ও কাগজপত্র পরীক্ষা করা হচ্ছে।
এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় ছায়া তদন্তের অংশ হিসেবে পিবিআই বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করছে। প্রমাণ ছাড়া কোনো তথ্য প্রকাশ করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই সবকিছু নিশ্চিত হওয়ার পরই তদন্তের তথ্য জানানো হবে।
ছেলেকে ধাওয়া করে নদীতে ফেলার দাবি মানছেন না বাবা
তাহসিফের বাবা একে এম এনায়েতুল করিম জানিয়েছেন, তাঁর ছেলে সাঁতার জানতেন। শুধু সাধারণভাবে সাঁতার শেখাই নয়, পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে তাঁকে সাঁতারের ওপর বিশেষ কোর্সও করতে হয়েছিল। এ বিষয়ে সনদও ছিল তাঁর কাছে।
এ কারণে দীপের জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসা ধাওয়ার মুখে তাহসিফের নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার বক্তব্য মেনে নিতে পারছেন না বাবা।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) পিবিআইয়ের কাছে দীপের দেওয়া তথ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটার কোনো যুক্তি তিনি দেখছেন না। তাঁর ছেলেকে কারা এবং কেন ধাওয়া করবে, সে বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তাহসিফের বাবা বলেন, তাঁর ছেলে পাইলট ছিলেন। পেশাগত প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবেই তাঁকে সাঁতারের বড় কোর্স সম্পন্ন করতে হয়েছিল এবং এ বিষয়ে তাঁর সনদও ছিল। তাই ধাওয়া খেয়ে পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার বক্তব্যের সঙ্গে তিনি একমত নন।
ঘটনাটি আড়াল করার চেষ্টা বা কোনো ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা করছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিস্থিতি দেখে তাঁর কাছে মনে হচ্ছে, মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। কেন তাঁর ছেলেকে ধাওয়া করা হবে, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তাঁর সন্দেহ হচ্ছে।
পুলিশের হেফাজতে দীপ, মোটরসাইকেল উদ্ধার
তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে তাঁর ছোট ভাইয়ের পরিচিত দীপের ফোন পেয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। পরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বৃহস্পতিবার রাতে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের হেফাজতে নেওয়া হয়। এরপর দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতভর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক পুলিশ সুপার জানান, জিজ্ঞাসাবাদের সময় দীপ তদন্তকারীদের বলেছেন, তাঁরা ঘটনাস্থলে বসে কথা বলছিলেন। এমন সময় কয়েকজন তাঁদের ধাওয়া করলে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। অন্যদিকে দীপ সেখান থেকে পালিয়ে আসেন।
দীপের এই বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল জানান, তাঁকে হেফাজতে নেওয়ার পর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই সেগুলো প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
এদিকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে তুরাগ নদের পাশের মাজার বস্তি এলাকায় নম্বর প্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেলের সন্ধান পাওয়া যায়।
পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ এক বার্তায় জানান, নদ থেকে আনুমানিক ৫০ গজ দূরে মাজার বস্তি এলাকায় মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে। সেটি তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল কি না, তা নিশ্চিত করতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
পিবিআইয়ের আরেক পুলিশ সুপার জানান, দীপের দেখিয়ে দেওয়া স্থান থেকেই নম্বর প্লেট না থাকা মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। নম্বর প্লেট না থাকায় এর প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত করতে কিছুটা সময় লাগছে। তিনি আরও জানান, তাহসিফ যেদিন বাসা থেকে বের হয়েছিলেন, সেদিন তাঁর ব্যবহৃত মোটরসাইকেলেও নম্বর প্লেট ছিল না। সিসিটিভি ফুটেজে বিষয়টি দেখা গেছে।
তাহসিফের মরদেহ বুধবার বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। জায়গাটি উত্তরখান থানার আওতাধীন। অন্যদিকে মোটরসাইকেলটি যে স্থান থেকে পাওয়া গেছে, সেটি টঙ্গী পশ্চিম থানার অধিক্ষেত্রের মধ্যে। তবে দুই জায়গাই তুরাগ নদের সঙ্গে সংযুক্ত।
রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন তাহসিফ
তাহসিফের বাবা একে এম এনায়েতুল করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দীপের ফোন পাওয়ার পরই বাসা থেকে বের হন তাঁর ছেলে। এরপর রাত ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে মায়ের মুঠোফোনে একটি বার্তা পাঠান তাহসিফ। সেখানে তিনি জানান, বাসার দিকে ফিরছেন।
তবে ছেলের পাঠানো বার্তাটির ধরন দেখে তাঁকে স্বাভাবিক মনে হয়নি বলে জানান বাবা। বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি বলেন, ওই বার্তা পাওয়ার পর থেকেই তাহসিফের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
এরপর বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে বুধবার বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ছেলের মৃত্যুর পর থেকেই তাহসিফের বাবা দাবি করে আসছেন, এটি স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ বের করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের পরিচয় জনসমক্ষে প্রকাশ করার জন্য প্রশাসন ও সরকারের কাছে বারবার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
তাহসিফের মৃত্যু কীভাবে হলো, ওই রাতে তাঁর সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল এবং দীপসহ অন্য কারও কোনো ভূমিকা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পিবিআই। ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষা, ফোনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাইয়ের মাধ্যমেই ঘটনার প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন তদন্তকারীরা।